কিশোরদের ভীতিকর গ্যাং কালচার

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০০

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার মান্ডা এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে মাহিম রহমান নামে এক কিশোর খুন হইয়াছে আর তাহার সঙ্গে থাকা বন্ধু মনা আহত হইয়াছে। পুলিশ এজাহারভুক্ত সাত জন ও সন্দেহভাজন দুই জনকে গ্রেফতার করিয়াছে। তাহারা সকলেই কিশোর। এরই মধ্যে তিন জন গত রবিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়া বলিয়াছে—কেন, কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়াছে। ১৬ ডিসেম্বর মানিকনগরের একটি স্কুলে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে লাইনে দাঁড়াইবার সময় সিনিয়র-জুনিয়র নিয়া রাকিবের সঙ্গে মনার দ্বন্দ্ব হয়, রাকিব গ্রুপ ও মনা গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তাহার পর হইতেই মনাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজিতে থাকে রাকিবরা। তবে নিহত মাহিম আসামিদের টার্গেট ছিল না।

এত সামান্য কারণে অল্প বয়সি কিশোররা খুনখারাবিতে জড়াইয়া পড়িবে ইহা কল্পনাতীত। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর উত্তরায় আদনান কবির নামের এক কিশোর হত্যার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে নেপথ্যের কারণ হিসেবে ‘গ্যাং কালচারের’ বিষয়টি সামনে আসে। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার হওয়ার পূর্বেই কিশোরদের একটা অংশের বেপরোয়া আচরণ এখন পাড়া মহল্লায় আতঙ্কের কারণ হইয়াছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্ভট উদ্ভট নাম দিয়া খোলা হইয়াছে এই সকল গ্রুপ। স্কুল ফাঁকি দিয়া ঘুরাঘুরি, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, মেয়েদের উত্যক্তকরণ, বাইক রেসিং দিয়া শুরু হইলেও পর্যায়ক্রমে মাদক, চাঁদাবাজি ও খুনের ঘটনায় জড়াইয়া পড়িতেছে কিশোর গ্যাংগুলো। কেবল রাজধানীতেই নহে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও তাহারা বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। ১৫-২০ বছর বয়সি কিশোরদের প্রতিটি গ্রুপে ১০-২০ জন করে সদস্য থাকে। রাজধানী জুড়িয়া এই রকম গ্যাং আছে প্রায় ৩০-৩২টি। তন্মধ্যে, ১৫-২০টি গ্রুপ অপরাধে জড়াইয়া পড়িয়াছে। ঢাকার বাহিরে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় আছে ২০-২৫টি কিশোর গ্যাং। চট্টগ্রাম শহরে আছে অন্তত ছয়টি গ্যাং। খুলনা শহরে কিশোরদের অন্তত সাতটি গ্যাং দাপাইয়া বেড়াইতেছে। মাদক, ডিজে পার্টি ও চুরি-ছিনতাই নিয়া ব্যস্ত থাকে এই সকল গ্যাংয়ের কিশোররা। প্রতি মাসেই রাজধানীর কোনো না কোনো এলাকায় তাহাদের দ্বারা নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হইতেছে। অভ্যন্তরীণ বিরোধে ঘটিতেছে একাধিক হত্যাকাণ্ড। ফলে, ‘গ্যাং কালচার’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগেরও কারণ হইয়াছে। অভিযানে বিভিন্ন সময়ে আটক হওয়া কিশোরদের পরিসংখ্যান আশঙ্কার মাত্রা বাড়াইয়াছে। গত তিন বছরে কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় ৪০০ সদস্যকে আটক করিয়াছে র্যাব চলতি বছরে ১৭৪ জন ও গত দুই বছরে ১৯০ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। ঢাকার শিশু আদালতের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৬টি খুনের ঘটনা ঘটিয়াছে!

নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশে এই গ্যাং কালচার তৈরি হইতে দেখা যায়, যাহাকে আইনের ভাষায় বলা হয় জুভেনাইল সাবকালচার। অনেক সময় বঞ্চনার কারণে কিশোরদের মধ্যে এমন দল গড়িয়া উঠে। আবার কোথাও কোথাও বীরত্ব দেখাইতেও ছেলেরা মাস্তানিতে যুক্ত হয়। নতুন মিডিয়া সংস্কৃতি এবং সেই সঙ্গে সন্ত্রাসনির্ভর ও নীতিবিবর্জিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি গ্যাং কালচার গড়িয়া উঠিবার প্রণোদনা জোগাইয়াছে। পাড়ায়-মহল্লায় আগেও এমনটা হইত, কিন্তু মাদক ও সহিংসতা তাদের মূলমন্ত্র হইত না। কিশোর অপরাধ রোধে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নহে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকেই মুখ্য ভূমিকা রাখিতে হইবে। সমাজের সকলকে কিশোর অপরাধ রোধেও আগাইয়া আসিতে হইবে।