রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী
পবিত্র বাইবেলের বর্ণনানুসারে আজ থেকে ২ হাজার বছর আগে যিহুদিয়া দেশের সর্বহারা রাখালদের কাছে স্বর্গদূতেরা যিশুখ্রিষ্টের জন্মের বিষয়ে এই আনন্দের গান গেয়েছিলেন, ‘ঊর্ধ্বলোকে ঈশ্বরের মহিমা, পৃথিবীতে তাহার প্রীতিপাত্র মনুষ্যদের মধ্যে শান্ত্তি’ (লূক ২:১৪)। জীবনযুদ্ধে সর্বস্বান্ত মানুষের জন্য সেদিন স্বর্গদূতেরা ত্রাণকর্তা খ্রিষ্টের শুভ জন্মবারতা শুনিয়েছিলেন। ঈশ্বর মানুষকে তার নৈতিক গুণাবলি দান করেছেন। মানুষের তাই প্রেম, পবিত্রতা ও ন্যায্যতার গুণাবলি আছে। কিন্তু মানুষের অহংকার ও লোভের কারণে মানুষ ঈশ্বরের কাছ থেকে ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ এবং তাত্ক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী ফলস্বরূপ ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনে হয়ে চলেছে যত অশান্তি, হিংসা এবং মানুষে মানুষে কলহ-বিবাদ এবং শোষণ ও বঞ্চনা। কিন্তু প্রেমময় স্রষ্টা ঈশ্বর তার সৃষ্টির গৌরব মানুষকে ভালোবাসেন এবং তার সামগ্রিক কুশল চান। স্বর্গের ঈশ্বর তাই পাপি মানুষের পাপ ও অনাচারে সৃষ্ট সমস্ত দুঃখ-কষ্টের বন্দিত্ব থেকে পরিত্রাণের জন্য যিশুখ্রিষ্টতে প্রকাশিত হয়েছেন। ঈশ্বরের পরিকল্পনা ও কাজ, তার উত্কণ্ঠা ও উদ্বেগ সমস্ত সৃষ্টি ও তার মধ্যে মানুষের এই পৃথিবীকে নিয়ে। শিষ্যদের শেখানো যিশুর প্রার্থনায় আছে, ‘তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হোক স্বর্গে ও পৃথিবীতে’। তাই ঈশ্বরের ইচ্ছা স্বর্গ ও পৃথিবী তারই প্রেম ও শান্তিতে পূর্ণ থাকবে। ২ হাজার বছর আগে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের সময় স্বার্থপরতা ও অহংকারের কারণে গোটা মানব জাতির যে অবস্থা ছিল, তা আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। হেন থেকে উদ্ধারের একমাত্র পথ মানুষের হূদয়ের পরিবর্তন। আজ সর্বত্রই অশান্তি, হিংসা, মূল্যবোধের অবক্ষয়। মানুষে মানুষে, ধনী-নির্ধনে, সবল-দুর্বলে, ক্ষমতাহীন ও ক্ষমতাপন্ন মানুষে ভেদাভেদ দিনে দিনে আকারে-প্রকারে বেড়ে চলেছে। বড়দিনের অর্থ ঈশ্বরের সুসমাচারের প্রতি সাড়া দেওয়ার আহ্বান। সেই সুসমাচার প্রত্যেক মানুষের পরিপূর্ণ মর্যাদার অধিকারের সুসমাচার। আজকের বিশ্বে মানুষ অসংখ্য সমস্যার সম্মুখীন। এসবের পেছনে রয়েছে মানুষের লোভ, হিংসা এবং ভোগবাদ ও বস্তুবাদ। ধর্মের লক্ষ্য মানুষের মধ্যে মানবীয় মূল্যবোধের বিকাশ ও বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ। কিন্তু আজও যেন ধর্মে-ধর্মে বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতা বেড়েই চলেছে।
ঈশ্বরের হূদয় দুঃখী-দুর্বলের ব্যথায় ব্যথিত। বাইবেলে পুরাতন নিয়মে বর্ণিত সবচেয়ে বড় এক ঐতিহাসিক ঘটনা অত্যাচারী ফেরাউনের দুঃশাসন ও দাসত্ব থেকে আব্রাহামের বংশধরদের জাগতিক ও রাজনৈতিক উদ্ধার ও মুক্তি। নতুন নিয়মে খ্রিষ্টের সাধিত মানুষের পাপ থেকে মুক্তি তারই বর্ধিত ও আধ্যাত্মিক সংস্করণরূপে এসেছে। জাগতিক মুক্তি না হলে আত্মিক মুক্তিও হয় না। ঈশ্বর মানুষের সমূহ মুক্তির জন্য মানবরূপে খ্রিষ্টের মধ্যে নিজের প্রেম, পবিত্রতা, ধার্মিকতা ও ন্যায্যতাকে প্রকাশ করলেন। মানুষের অবস্থাকে নিয়ে তিনি কেবল ভাবেননি, ঈশ্বরবিহীন মানুষের অবস্থাকে নিজে ভোগ করলেন। কারণ তিনি তার বাস্তবতাকে পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছেন। আজ গোটা পৃথিবীর ৯০ ভাগ সম্পদের মালিক মাত্র ১০ ভাগ ধনী মানুষ; ফলে বাকি মাত্র ১০ ভাগ সম্পদ নিয়ে ৯০ ভাগ লোককে কোনোমতে বাঁচতে হয়। প্রতিদিন বড়দিন আবার ফিরে এসেছে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে খ্রিষ্টের সেই আজ্ঞাকে— ‘তুমি ঈশ্বরকে তোমার সর্বস্ব দিয়ে প্রেম করবে এবং অন্য মানুষকে নিজের মতোই প্রেম করবে।’ তাই ঈশ্বর ও মানুষকে আমাদের সম্মান করতে ও ভালোবাসতে হবে। আমরা মানুষকে ভালো না বেসে ঈশ্বরকে ভালোবাসতে পারি না!
মানুষ যদি যিশুখ্রিষ্টের নিঃস্বার্থ প্রেম এবং জগত্ ও জীবন সম্পর্কে তার পবিত্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে চেষ্টা করত, তাহলে পৃথিবীর অবস্থা কতই না সুন্দর ও শান্তিময় হতো! দুঃখের বিষয়, আমরা যারা তাকে বা তার শিক্ষাকে প্রচার করি, অনেকেই তা নিজেদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করি না। এই ভোগবাদ-মত্ত পৃথিবীতে বড়দিন বারবার ফিরে আসে আমাদের এ আহ্বান জানাতে, যেন আমরা একে অন্যের সঙ্গে শান্তি ও সমৃদ্ধ জীবনের জন্য একত্রে বাস করি। আমাদের এই ভাবনা সবার মধ্যে জাগরিত হোক, হোক তা কাজে পরিণত। ঈশ্বরের শাশ্বত বাক্য যেমন খ্রিষ্টে মাংসে মূর্ত হয়েছে, তেমনি কাজে রূপ নিক আমাদের সব সুন্দর চিন্তা ও শিক্ষা। বড়দিনে দূরের ঈশ্বর মানুষের কাছে এলেন, মানুষকে তিনি নিজের সঙ্গে সম্মিলিত করলেন; মানুষ যেন মানুষের সঙ্গে শান্তি ও প্রেমে সম্মিলিত হতে পারে।
n লেখক :সাবেক অধ্যক্ষ, বাইবেল কলেজ, সাভার
