আমার মা

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০১

তোফায়েল আহমেদ

আজ মায়ের ত্রয়োদশতম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৬-এর ২৫ ডিসেম্বর সবার মায়া ত্যাগ করে তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তানের কাছে মা পরমারাধ্য। আমার জীবনেও মা প্রিয় মানুষ, শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মায়ের স্নেহ-আদর আর মমতায় বড়ো হয়েছি। মায়ের স্নেহ আজও অন্তরে প্রবহমান। মায়ের পবিত্র মুখখানি যখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনে হয়, এখুনি মায়ের কাছে ছুটে যাই। মা ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতাম না। শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে দুচোখ ভিজে যায়।

আমার বাবা মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭০-এর ২৫ এপ্রিল। সেদিন জনসভা ছিল চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। বাবার মৃত্যুসংবাদ আমার আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে আমাদের প্রিয় নেতা এম এ আজিজকে জানিয়েছিলেন, ‘তোফায়েলের বাবা মৃত্যুবরণ করেছে।’ মিরসরাইয়ের জনসভায় এম এ আজিজ ভাইসহ যখন সভা করছি, তখন আমার বক্তৃতা শেষে আজিজ ভাই বললেন, আমি যেন অনতিবিলম্বে ভোলা চলে যাই। বক্তৃতা শেষে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আক্তারুজ্জামান বাবু ভাইয়ের ছোটো ভাই বশুরুজ্জামান—যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন—তার গাড়িতে করে চাঁদপুর অবধি পৌঁছে দেন এবং ২৬ তারিখ সকালবেলা গ্রামের বাড়ি পৌঁছাই। ততক্ষণে বাবার দাফন হয়ে গেছে।

মা ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। তিন ভাই, চার বোনের মধ্যে আমার অবস্থান পঞ্চম। বিদ্যালয়জীবনের সূচনাতে নিজ বাড়িতে থেকে গ্রামের একটি প্রাইমারি স্কুল কোড়ালিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। এরপর বাড়িতে থেকেই খায়েরহাট জুনিয়র হাই স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পাশ করে বোরহানউদ্দিন হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। প্রাইমারি এবং জুনিয়র স্কুলের পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে ভালো নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করতাম। আজকাল গ্রামে উপজেলায় অনেক হাইস্কুল হয়েছে। তখনকার দিনে এত হাইস্কুল ছিল না। আমাদের এলাকা বোরহানউদ্দিনে একটি মাত্র হাইস্কুল ছিল, সেখানে ভর্তি হই। বোরহানউদ্দিন হাই স্কুলে আমাকে কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হয়েছে। সেকালে আমাদের গ্রাম অনুন্নত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।  কষ্ট হলেও মা আমাকে আদর করে লেখাপড়ায় নিয়মিত উত্সাহ জোগাতেন। ১৯৫৭-র জানুয়ারি মাসে ভোলা সরকারি স্কুলে ভর্তি হই এবং স্কুল হোস্টেলে থাকতে শুরু করি। শুরু হয় হোস্টেলে থেকে লেখাপড়ার পালা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মোট ১৪টি বছর আমি হোস্টেলে ছিলাম। মা আমাকে আদর করে ‘মনু’ বলে ডাকতেন।

সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। মায়ের স্মৃতিকে আমি ধরে রাখতে চাই। বাবা-মায়ের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মায়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। জীবনে স্বপ্ন ছিল বৃদ্ধাশ্রম করার। যেখানে আমার মায়ের মতো মায়েদের সেবা-শুশ্রূষা করতে পারব। ’৯৬-এ সরকার গঠনের পর আমি তখন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বেইলি রোডে অবস্থিত বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গেই থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর যে বাসায় এখন থাকি এই বাসাতে আমার শয়নকক্ষের পাশেই মায়ের ঘর। সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন ছিল নিত্যদিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম।

’৭৩-এ ভোলার বাংলাবাজারে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেছি একটি গার্লস হাই স্কুল। যার নাম ‘ফাতেমা খানম গার্লস হাই স্কুল’। সেখানে আজ ৬০ বিঘা জমির ওপর মায়ের নামে ‘ফাতেমা খানম ডিগ্রি কলেজ’, ‘ফাতেমা খানম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’, ‘ফাতেমা খানম এতিমখানা’, ‘ফাতেমা খানম জামে মসজিদ’, ‘ফাতেমা খানম বৃদ্ধাশ্রম’সহ গড়ে উঠেছে সাজানো-গোছানো সুবিশাল ‘ফাতেমা খানম কমপ্লেক্স’। এই কমপ্লেক্সেই গরিব-দুঃখীর চিকিত্সাসেবায় পিতা-মাতার নামে ‘আজহার-ফাতেমা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। যার কাজ চলছে। এর লাগোয়া স্থানে নির্মিত হয়েছে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’, যা গত বছর ১৭ জানুয়ারি মহামান্য রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। যেখানে সংরক্ষিত আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক অবদানের স্মৃতি-নিদর্শনসমূহ। মইনুল হোসেন বিপ্লব এসব দেখাশোনা করে। মায়ের শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। মায়ের নামে দৃষ্টিনন্দন একটি ‘বৃদ্ধাশ্রম’ করার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, বঞ্চিত মায়েদের সেবাপ্রদান। ভোলা গেলে বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানরত মায়েদের সঙ্গে দেখা করি। সেখানে তাদের জন্য সকল সুবিধা নিশ্চিত করেছি। এখানে এমন মা আছেন, যার পুত্র এবং পুত্রবধূ উভয়েই ডাক্তার, এমন মা আছেন যিনি অনার্স পাশ, কিন্তু তারা আমার এই বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেই পছন্দ করেন। আমি যখন যাই, আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেন। তাদের মাধ্যমে মায়ের স্পর্শ পাই। আর সকলের মতো আমিও মনে করি আমার মা-ই শ্রেষ্ঠ। আজ এই বনানীর বাড়িতে আছি, গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, একাধিকবার মন্ত্রী হয়েছি, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বখ্যাত নেতার সান্নিধ্য পেয়েছি। জীবনে এগুলো কল্পনাও করিনি। এমন মমতাময়ী মায়ের সন্তান হতে পেরে আমি গর্বিত, ধন্য!

n লেখক :আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ