নুরের ওপর হামলার ঘটনায় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:২৪

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর ও তার সহযোগীদের ওপর ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের হামলার ঘটনায় পুলিশ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এদিকে হামলার বিচারের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্যের’ ব্যানারে ‘ছাত্র-জনতার            সমাবেশ’ নামে এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে প্রক্টরকে হামলার দায়ভার নিয়ে পদত্যাগ ও সিসিটিভির ফুটেজ উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে। দাবি আদায় না হলে সারাদেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক। সমাবেশের আগমুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে শোডাউন দিয়েছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের তিন নেতার রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

ছাত্রজনতার সমাবেশে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন দৃক ফটো গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ও আলোকচিত্রী শহীদুল আলম। শহীদুল আলম বলেন, ‘যে সময়ে সারাদেশের মানুষ ভয় পাচ্ছে, সেখানে আমরা যে সবাই সেভাবে ভয় পাই না, সেটা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমি আপনাদের সম্মান জানাই। আপনাদের দেখাদেখি দেশবাসী জেগে উঠবে এবং মানুষের ঢল যখন নামবে, তখন কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না।’

গ্রেফতার তিন নেতা রিমান্ডে, মামলা

হামলার ঘটনায় নতুন করে গ্রেফতার করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সম্পাদক মেহেদি হাসান শান্তকে। আটককৃত তিন নেতার বিরুদ্ধে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম মাইনুল ইসলাম শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে নেওয়া নেতারা হলেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত তূর্য ও দপ্তর সম্পাদক মেহেদি হাসান শান্ত।

হামলার ঘটনায় ৪৩ জনের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে মামলা করেছে শাহবাগ থানার পুলিশ। সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে আট জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৩৫ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়। মামলার আট আসামি হলেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, ঢাবি শাখার সভাপতি এ এস এম সনেট, সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত তূর্য, এ এফ রহমান হল শাখা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক ইমরান সরকার, কবি জসীমউদ্দীন হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ইয়াদ আল রিয়াদ (হল থেকে অস্থায়ী বহিষ্কৃত), জিয়া হল শাখা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম মাহিম ও মাহবুব হাসান নিলয়।

সাদা দলের মানববন্ধন

হামলার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সাদা দল। দুপুর ১২টার ঐ মানববন্ধনে শিক্ষকেরা বলেন, ডাকসু ভিপির ওপর হামলা মানে গোটা জাতির ওপর হামলা, পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হামলা।

অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য নষ্ট করেছে এই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। এই হামলার পর আমরা শিক্ষক হিসেবে লজ্জিত। শুধু এই ঘটনা নয়, আজ ঢাবির বিভিন্ন হলেও সন্ত্রাসী হামলা চলে। মতের ভিন্নতা হলেই মার দেওয়া হয়। ভিপি তাদের মত সমর্থন করে না বলে তাকে মারা হয়েছে।’

রোকেয়া হলের সাবেক প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. লায়লা নূর ইসলাম সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, ডাকসু সমগ্র জাতির গৌরবের জায়গা। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি না এই বিচারহীনতার দেশে। আমাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটার পর একটা ঘটনা ঘটিয়ে পূর্ব ঘটনা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন দল।’ সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অর্ধশতাধিক শিক্ষক এতে অংশ নেন।

অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন

হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিক সমাজ’। প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। এ সময় উপাচার্যের কাছে কৈফিয়ত চান উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। এ সময় তাদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ভিসি আপনি জবাব দিন। আমরা আপনাকে বেতন দেই না? ছেলেমেয়েরা কেন নিরাপত্তাহীন?’

স্মারকলিপিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা হরহামেশাই বিভিন্ন প্রকার নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু তাঁরা আপনার কাছ থেকে কোনা প্রতিকার পাচ্ছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য হওয়া সত্ত্বেও আপনি সব শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকসুলভ নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

এ সময় উপাচার্য জানান, তারা এ বিষয়ে পুলিশের সাহায্য চেয়েছেন? বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে?

ভিপি নুরের অভিযোগ

হামলার দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় অভিযোগ করেছেন ভিপি নুরুল হক নুর। শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, একটি ঘটনা নিয়ে দুটি মামলা হয় না। একটি মামলা হওয়ায় আগের করা পুলিশের মামলার সঙ্গে অভিযোগ সংযুক্ত করে একসঙ্গে তদন্ত করা হবে।

গত রবিবার ভিপি নুরুল হককে তার ডাকসুর কক্ষে ঢুকে বাতি নিভিয়ে পেটান মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। ভিপি নুরসহ আহতদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ এ হামলায় সরাসরি অংশ নেয়। এ সময় নুরের সঙ্গে থাকা ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্তত ৩০ জনকে বেধড়ক মারধর করা হয়।