বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে বাড়ছে না রপ্তানি

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৭:০৪

সরকারের রূপকল্প অনুসারে অবকাঠামো উন্নয়নে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে অনুপাতে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রবৃদ্ধি হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। বিশেষ করে রপ্তানির প্রধান খাত গার্মেন্টসের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি থেকেই সংশয়ের উদ্রেক হয়েছে। গার্মেন্টসের বিপরীতে অন্য রপ্তানি খাতও শক্ত অবস্থানে আসতে পারছে না।

রপ্তানিতে এখনো গার্মেন্টস খাতের অবদান এককভাবে ৮৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গার্মেন্টস পণ্যের রপ্তানি কমেছে পৌনে ৮ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক রপ্তানি আয়ে। আলোচ্য সময়ে সার্বিকভাবে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আমদানিও কমতির দিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।


গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশের গার্মেন্টস খাত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কমপ্লায়েন্ট (কর্মপরিবেশসম্পন্ন) কারখানা গড়ে তুলতে গিয়ে বিশাল বিনিয়োগ হয়েছে। তা থেকে যে রিটার্ন পাওয়ার আশা করেছিলেন উদ্যোক্তারা, বাস্তবে তা অর্জিত হচ্ছে না। বাড়তি বিনিয়োগের বিপরীতে রপ্তানি পণ্যের বাড়তি দর আশা করেছিলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু বায়াররা তা দিচ্ছে না বরং ক্ষেত্রেবিশেষে মূল্য কমেছে বলে রপ্তানিকারকরা দাবি করছেন। এ পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তাই লোকসান এড়াতে এবং টিকে থাকতে কম দরে ক্রয়াদেশ (অর্ডার) নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি কমেছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ১ হাজার ৮০৫ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৫৭৮ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৭০৭ কোটি ডলারের পণ্য। অন্যদিকে প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টসেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। গত পাঁচ মাসে ১ হাজার ৫১৫ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার। গত অর্থবছর গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলার বা ৩৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ ২০২১ সালে আরএমজি (রেজিমেইড গার্মেন্ট) সেক্টরের রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল সরকার।

গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক সম্প্রতি ইত্তেফাককে বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৫০ বিলিয়ন রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার কথা একবারও বলেননি। তিনি বরং আগামীদিনে এই সেক্টর টিকে থাকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন, ৫০ বিলিয়ন রপ্তানি যে কোনো সময় করা যায়। কিন্তু তা তো কোনোভাবেই এ সেক্টরের জন্য শুভ হবে না। তিনি ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ অর্ডার যাচ্ছে তাতে উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। চলতি অর্থবছরের সমাপ্ত নভেম্বর মাস পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক রয়েছে। ফলে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামীদিনগুলোতে অকল্পনীয় প্রবৃদ্ধি ও সাফল্য অর্জন করতে হবে।

এদিকে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ নয়। কাস্টমসের পরিসংখ্যানে শিল্প খাতে বিকাশের প্রধান উপকরণ ক্যাপিটাল মেশিনারিজের আমদানি হ্রাস পেয়েছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের ফলে আমদানি ও রপ্তানির ঋণাত্মক অবস্থার কারণে শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এমনকি গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানে দেশের প্রধান বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পণ্যবাহী কন্টেইনারের প্রবাহ কমে গেছে। উচ্চ শুল্কের বাণিজ্যিক পণ্যের আমদানি কমে গেছে। ফলে কাস্টমসের শুল্ক আদায় ক্ষেত্র বিশেষে গত বছরের চেয়েও কমে গেছে। শুধু চট্টগ্রাম কাস্টমস নয়, দেশের অন্যান্য শুল্ক আদায় স্টেশনের অবস্থাও প্রায় অনুরূপ বলে জানা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান এবং দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাত পোশাক শিল্প কারখানার নেতিবাচক অবস্থা ২০২১ সালের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দুরূহ হয়ে পড়বে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিমধ্যে চলমান এবং স্বল্প মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন হলে যে পরিমাণ আমদানি-রপ্তানির প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন পড়বে তা আদৌ অর্জিত হবে কি না অনেকে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের কাজ সম্পন্ন হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে বেশি সক্ষমতার বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে আংশিক সম্পন্ন হবে। একইভাবে মাতারবাড়ী এলাকার গভীর সমুদ্র বন্দরও দুই-তিন বছরের মধ্যে দৃশ্যমান হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন হলে দেশের আমদানি-রপ্তানির আয়তনও অনেক বেশি হতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বর্তমানে বছরে ৭ লাখ কন্টেইনার রপ্তানি কাজে ব্যবহূত হয়। আরো প্রায় ৮ লাখ কন্টেইনার এক প্রকার খালি অবস্থায় ফেরত্ যায়। ফলে বর্তমান অবস্থায়ও আরো সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব।

চট্টগ্রাম বন্দরে গত বছর অর্থাত্ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয় ২৯ লাখ ১৪ হাজার। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ৩০ লাখ ৭০ হাজার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৭৭২টি। যা গত বছরের হ্যান্ডলিংকে ছাড়িয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এই সক্ষমতা বেড়েছে নতুন কন্টেইনার টার্মিনাল বা ইয়ার্ডের সম্প্রসারণ ছাড়াই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, এটি বন্দরের ইকুইপমেন্ট সংখ্যা বৃদ্ধিসহ পরিচালনা দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে সক্ষম হয়েছে। বছর শেষে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৬ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান নতুন বন্দর ও টার্মিনাল নির্মাণকাজ সম্পন্নের

আগেই এগুলোর সক্ষমতাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগানোর জন্য অভ্যন্তরীণ এবং প্রয়োজনে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিকল্পনার পথে এগিয়ে যেতে হবে বলে বন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

আরও পড়ুন: মাঠ থেকে পালিয়ে গিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চক্রান্ত করবেন না: বিএনপিকে নাসিম

বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ জানান, চট্টগ্রাম বন্দর আরো প্রায় দ্বিগুণ রপ্তানি বর্তমান সক্ষমতায় করতে পারে। তাছাড়া চলমান ও ভবিষ্যত্ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে পণ্য হ্যান্ডলিং ক্ষমতা আরো বহু গুণে বেড়ে যাবে।

ইত্তেফাক/নূহু