রাজশাহীতে এক দশকে ৫ হাজার নতুন পুকুর খনন!

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৩৮

আনিসুজ্জামান, রাজশাহী

রাজশাহীতে এক দশকে ৫ হাজারের বেশি নতুন পুকুর খননের খবর পাওয়া গেছে। না পরিবেশ উন্নয়নের জন্য নয়, সেচের জন্যও নয়। জেলার নয়টি উপজেলা জুড়ে এসব পুকুর খনন করা হয়েছে মাছ চাষের জন্য। প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর ঊর্বর কৃষিজমিতে এসব পুকুর খননের কারণে লাখ লাখ একর জমি সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে। নতুন খননকৃত ঐসব পুকুরের মাটি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে ইটভাটায়। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখনো থেমে নেই পুকুর খনন ও ইটভাটা নির্মাণ। স্থানীয় প্রশাসনকে নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করে চলছে অবৈধ পুকুর খনন। ফলে নষ্ট হচ্ছে ঊর্বর ফসলি জমি। পুকুর খনন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও ইটভাটা বন্ধে পদক্ষেপ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনে অভিযান চালিয়ে যে পুকুর খনন বন্ধ করা হচ্ছে, রাতের আঁধারে সেই পুকুর খনন করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো উপজেলায় পুকুর খনন-বিরোধী ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কোনো সহযোগিতাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে গত এক দশকে রাজশাহীতে পুকুর খননের কারণে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর।

রাজশাহীতে নতুন পুকুর খননের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত রাজশাহীর বাগমারা, পবা, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর ও পুঠিয়া উপজেলায় পুকুর খননের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর পরও দু একটি উপজেলায় প্রশাসন পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। কিন্তু এতে কোনো লাভ হচ্ছে না। পবা উপজেলায় প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালায়। তারপরও উপজেলার বড়গাছি এলাকায় পুকুর খনন চলছে। গ্রামের আনারুল ইসলাম ঐ পুকুর খনন করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আনারুল ইসলাম পুকুর খননকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। তিনি বাইরের পার্টির সঙ্গে মধ্যস্থতা করে এলাকায় পুকুর খনন করাচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনি বড়গাছি বিলেই ১০০ বিঘা পুকুর খনন করিয়েছেন। আরও ৮ বিঘায় খননকাজ চালাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত দিনে অভিযান চালিয়ে খননকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু রাতে আবার ড্রেজার নিয়ে গিয়ে পুকুর খনন করা হচ্ছে। শুধু আনারুলই নয়, জেলা জুড়ে অবস্থাসম্পন্ন মানুষ পুকুর খনন ও মাছের ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চলেছেন।

এ ব্যাপারে পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল হায়াত বলেন, পুকুর খনন কেউ করছে, এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই অভিযান চালানো হবে। এ বছর পবা উপজেলায় ৩০টি অভিযান চালানো হয়েছে। ২৫টি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু দু-এক দিন পর তারা আবার খনন শুরু করে। একই অবস্থা চলছে জেলার অন্যান্য উপজেলায়। তানোরের চান্দুড়িয়া বিলের প্রায় সিংহভাগ কৃষিজমি এখন নতুন পুকুর হয়ে গেছে। রাজশাহী কৃষি বিভাগ বলছে, কয়েক বছর ধরেই গোদাগাড়ী, পবা, তানোর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, মোহনপুর, বাঘা ও চারঘাট এলাকায় ঊর্বর ফসলি জমিতে পুকুর-দিঘি খননের হিড়িক চলছে। প্রতি বছরই ছোটোবড়ো ১ হাজার নতুন পুকুর খনন হচ্ছে। গত এক দশকে জেলায় নতুন ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে। এসব পুকুরের কারণে লাখ লাখ হেক্টর জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া সহস্রাধিক ইটভাটায় খেয়ে ফেলেছে আরো ৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি। যেটুকু কৃষিজমি আছে ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও জলাবদ্ধতায় ফসল উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। বাগমারার মির্জাপুর, আরঙ্গবাদ ও বিশুপাড়া মৌজায় এক কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি ইটভাটা রয়েছে। তিন ফসলি জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ইটভাটা। ইটভাটায় ব্যবহূত হচ্ছে নতুনভাবে খননকৃত পুকুরের মাটি।

কৃষিজমি নষ্ট করে কেন পুকুর খনন?

নতুন পুকুর খনন অব্যাহত রাখার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয় কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় জমির মালিকরা পুকুর খননকারীদের কাছে তাদের কৃষিজমি দীর্ঘ মেয়াদের জন্য লিজ দিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের চেয়ে মাছ চাষ লাভজনক হওয়ায় মাছচাষিরা বিষয়টি লুফে নিচ্ছে। রাজশাহী জেলার নয়টি উপজেলায় পুকুর খননে জমি লিজ দেওয়া অধিকাংশ কৃষক এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি মত্স্য এবং কৃষি সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করেন। কিন্তু বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই।     

রাজশাহী কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সামশুল হক বলেন, ‘বেশির ভাগ পুকুর খনন করা হয়েছে নিষ্কাশন নালা, জলাধারের সেতু-কালভার্টের মুখ বন্ধ করে। ফলে কম বৃষ্টিতেই পুকুর-দিঘিসংলগ্ন কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে লাখ লাখ হেক্টর ঊর্বর ফসলি জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না চাষিরা। এর ফলে ধান, পাট, গম, আলু, সবজি, মরিচ, সরিষা, পিঁয়াজ ও রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী পানের উত্পাদনই শুধু কমছে না গবাদিপশুর বিচরণভূমিও নষ্ট হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন সভায় কৃষিবিভাগ থেকে এসব বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও বন্ধ হয়নি পুকুর খনন।’