সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও ক্ষমতা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১০

 চিররঞ্জন সরকার

আমাদের দেশে নির্বাচন মানেই হচ্ছে যুদ্ধ। তা সে স্কুল পরিচালনা কমিটি কিংবা বাজার পরিচালনা কমিটিই হোক, আর সংসদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্ব্বার পদে নির্বাচনই হোক। আপাতত নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোট হবে আগামী ৩০ জানুয়ারি। এরই মধ্যে বড়ো রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছে। দুই সিটির নির্বাচন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ ভোটকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছেন তারা।

সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণে সাঈদ খোকন ও ঢাকা উত্তরে আনিসুল হক। তবে ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তরে উপনির্বাচন হয়, যেখানে মেয়র হয়েছিলেন আতিকুল ইসলাম।

এবার সব কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে। প্রতি কেন্দ্রে দুজন সেনার উপস্থিতিতে ইভিএমে আসন্ন ভোট অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে পারাটা সত্যিই একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। সবাই আশা করছেন অতীতের সব সমালোচনা, ক্লেদ ঝেড়ে ফেলে এবার সবার জন্য মাঠ সমতল করার কাজটি ভালোভাবে সম্পন্ন করবে কমিশন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভোট আমাদের নিরুত্তাপ রাজনৈতিক জীবনে আবারও কিছুটা উত্তাপ ও উত্তেজনা নিয়ে এসেছে। এটা অবশ্য ভোটের গুণ। ভোট আমাদের নিরানন্দ জীবনে নিয়ে আসে উত্সবের আমেজ। সাধারণ মানুষ আলোচনার খোরাক পায়। ভোটের প্রায় এক মাস আগে থেকে শুরু হয়ে এক মাস পর পর্যন্ত এ আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। যদিও বিগত জাতিয় নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি কতটা ছিল সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রশাসনের লোকেরা মনে করেছেন তারাই এ নির্বাচন করেছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই রুলস অব বিজনেস পড়েন না, সে সম্পর্কে কোনো ধারনাও রাখেন না। মনে করেন, সমস্ত ক্ষমতার যাদের হাতে, আমরা তাদেরই প্রতিনিধি।

তবে ভোটের সবচেয়ে বড়ো গুণ হচ্ছে ভোট ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, জাত-পাত সবকিছু ঘুচিয়ে দেয়। উদ্ধত মাস্তান, হোমরা-চোমরা প্রভাবশালী, সহায়-সম্ব্বলহীন দীনভিখারি সবার পরিচয় কেবল ভোটার। বুদ্ধিজীবীর ভোট, মন্ত্রীর ভোট, ভয়ংকর সন্ত্রাসীর ভোট আর একজন সাধারণ ভিখারির ভোটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবারই একটি মাত্র ভোট। সবাই ভোটার এবং সবার ভোটের সমান দাম। ভোট ভোটারদের মহিমান্বিত করে। এদেশে ভোটের সময় ছাড়া অন্য সময়ে ভোটাররা খুব একটা মর্যাদা বা সম্মান পান না। কিন্তু ভোটের সময় ভিন্ন পরিস্থিতি। ভোটে যে প্রার্থীই জয়ী হোক, তাতে সাধারণ ভোটারদের তেমন একটা লাভ লোকসান হয় না। তবু ভোটাররা ভোট এলে উদ্দীপ্ত হয়। উত্তেজনা অনুভব করে। এর কারণ অন্য কোনো সময়ই ভোটপ্রার্থী বা ভোটবিজয়ী নেতারা তাদের সম্মান বা খাতির করে না। এই সময় সুখ-দুঃখের কথা জিগ্যেস করেন। নানারকম সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেন। ভোটের সময় প্রার্থীদের কাছ থেকে এই যে দুর্লভ সুব্যবহার এবং সম্মান ভোটাররা পান, তার কোনো তুলনা হয় না। তাই তো নিজের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না, তেমন কোনো কল্যাণ হবে না জেনেও ভোটাররা ভোটের সময় উল্লসিত হন।

ভোট রঙের কোনো তুলনা নেই। এর কোনো শেষও নেই। ভোটের প্রচার কৌশল নিয়েও নানা কৌতুক চালু আছে। যেমন—দুই সমর্থকের মধ্যে কথা হচ্ছিল। ‘এ’ দলের সমর্থক বলছে, আমি যখন কোনো রিকশা বা ট্যাক্সিতে চড়ি তখন চালকের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করি। প্রথমে তার ছেলে-মেয়ের খোঁজখবর নেই, তাকে মোটা বকশিস দেই এবং নামার সময় বলি, ‘এ’ দলকে ভোট দিও। ‘এ’ দলের সমর্থকের কথা শেষ হলে হাসি দিয়ে ‘বি’ দলের সমর্থক বলেন, আমি রিকশা কিংবা ট্যাক্সিতে উঠেই ড্রাইভারকে গালি দিতে শুরু করে দেই। সিগারেট ধরিয়ে তার মুখে ধোঁয়া ছেড়ে দেই, এক টাকাও টিপস দেই না। তবে নামার সময় তোমার মতোই বলি—‘এ’ দলকে ভোট দিও!

আসলে নির্বাচনে সবাই জিততে চায়। জেতার জন্য নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চায়। কিন্তু নির্বাচনে জেতার আসল এবং একমাত্র লাগসই পদ্ধতি হচ্ছে, ভোটারের মন পাওয়া। এজন্য দল, প্রার্থী, তাদের সমর্থক, জনকল্যাণে ভূমিকা, প্রতিশ্রুতি, কার্যক্রম-সবকিছুই ভালো হতে হয়। সবকিছু দিয়েই ভোটারদের মন জয় করতে হয়। তা না হলে সব উদ্যোগ ও কৌশলই ব্যর্থ হতে পারে।

ভোটের মাধ্যমে আসলে অনেকেই চান ক্ষমতাবান হতে। আর ক্ষমতা থাকলে যে সম্মান-অর্থ-দাপট সবকিছুই মেলে—এ কথা কে না জানে?

‘ক্ষমতা’ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি পুরোনো কাহিনি। বনের রাজা বলে পরিচিত সিংহ এক দিন ইচ্ছে পোষণ করল, নিজের ক্ষমতা-দাপট উপভোগ করবে। বনের পথে যাকে পায় তাকেই জিগ্যেস করতে থাকল, ‘বলতো, বনের রাজা কে?’

প্রথমেই সামনে পড়ল ছোট্ট নিরীহ খরগোশ। খরগোশ ছিল ক্ষুধার্ত। স্বাভাবিক কারণেই মন-মেজাজ খারাপ। সিংহ তাকে প্রশ্ন করল, ‘বলতো, বনের রাজা কে?’ গোবেচারা খরগোশ কোনো কিছু না ভেবেই বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘কে হবে মেম্ব্বার, কে বা গ্রাম সরকার আমরা কি তার খবরও লইতাম ‘স্টাইলে বলে ফেলল, ‘এসব ফালতু বিষয় নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। পেটের ধান্ধাতে বাঁচি না, আর উনি এসেছেন রাজা-উজির মারতে।’

বনের রাজা হিসেবে নিজের নাম না শুনে সিংহের মেজাজ গেল বিগড়ে। এক থাবায় খরগোশকে নিজ পেটে চালান করে দিল। পুরো ঘটনাটি ঘটতে সময় লাগল এক মিনিটেরও কম, মাত্র ৩৭ সেকেন্ড।

এরপর সিংহের সামনে পড়ল বানর। একই প্রশ্ন করা হলো তাকেও। খরগোশের করুণ পরিণতির খবর ততক্ষণে চারিদিকে চাউড় হয়ে গিয়েছে। তাই বানর সিংহের উদ্দেশ্যে ‘বনের রাজা আপনি ছাড়া আবার কে’ বলে কোনো মতে প্রাণ নিয়ে চলে গেল।

তার পর দেখা শেয়ালের সঙ্গে। যথারীতি একই প্রশ্ন ‘বল, বনের রাজা কে?’ ধূর্ত শেয়াল পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে উত্তর দিল, ‘জাহাঁপনা, আজ প্রশ্ন উঠছে কেন তাই তো বুঝতে পারছি না। সারাজীবন শুনে এসেছি ‘বনের রাজা সিংহ।’

এক পর্যায়ে সিংহের সামনে পড়ল এক হাতি। বনে কলাগাছ কমে যাওয়ায় তার খাদ্যাভাব চলছে এবং সে কারণে মেজাজ তিরিক্ষি। সিংহ যথারীতি প্রশ্ন করল হাতিকে ‘বল, বনের রাজা কে?’ ক্ষুধার্ত হাতি ক্রুদ্ধ হয়ে শুঁড় দিয়ে সিংহকে পেঁচিয়ে মারল একটা আছাড়।

তখন সিংহ হাতিকে বলল, ‘প্রশ্নের উত্তর জানা নেই এটা বললেই হয়, রাগ করার কী আছে? সবাই কি সবকিছু জানে?’ এটা বলে নিজের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়াটা লুকাতে চাইল। আসলে আছাড় খেয়ে বনের রাজার অবস্থা কাহিল। ব্যথায় কাতর হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকল।

বিকালে সেই পথ দিয়েই ফিরছিল শেয়াল। সে দেখে সিংহ হাত-পা ছড়িয়ে রাস্তায় শুয়ে আছে। সকালে খরগোশের করুণ পরিণতির কথা আবার শিয়ালের চোখে ভেসে উঠল। সে বিনয়ের অবতার হয়ে সিংহকে বলল, ‘হে রাজাধিরাজ, পশুপতি মহাশয়, আপনি কি একটু পেরেশান আছেন? তবিয়তটা বড়োই কাহিল মনে হচ্ছে।’ সিংহ তখন আবেগাপ্লুত হয়ে হাতির দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি বলল। একই সঙ্গে এটাও বলল যে, সেই ভয়াবহ আছাড় খাওয়ার কারণে তার শরীর প্রচণ্ড ব্যথা করছে এবং কোনোমতেই উঠতে পারছে না, এমনকি একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না।

একথা শুনে শেয়ালের চেহারা, ভাবসাব ও শব্দচয়ন পালটে গেল। সে চিত্কার করে বলল, ‘হালার পুত, এর জন্য কি রাস্তার মইধ্যে খানে হাত-পাও ছড়াইয়া শুইয়া থাকন লাগবো? রাস্তাডা কি তর বাপের জায়গা? ভালো চাইলে তাড়াতাড়ি রাস্তা ছাইড়া শো। নাইলে কইলাম চড়াইয়া তর সব কয়ডা দাঁত ফালাইয়া দিমু। হারামজাদা!’

কোথায় গেল রাজাধিরাজ, আর কোথায় গেল পশুপতি মহাশয়!

n লেখক :রম্যরচয়িতা