সাধন সরকার
ভূপৃষ্ঠের ওপরের নরম আবরণকেই সাধারণত মাটি বলা হয়। জলবায়ু ও জৈব পদার্থের সমন্বয়ে রূপান্তরিত শিলার ওপর গাছ জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয় এই মাটিতে। এই মাটিই উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন। মাটির মধ্যে চারটি উপাদান বিদ্যমান: অজৈব বা খনিজ উপাদান (৪৫%), বায়ু (২৫%), পানি (২৫%) এবং জৈব পদার্থ (৫%)। মাটির উপাদানগুলোর মধ্যে সবসময় বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে। মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ মাত্র ৫ ভাগ হলেও এই জৈব পদার্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জৈব পদার্থ মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণীজ উপাদান থেকেই গঠিত। মাটির নাইট্রোজেনের উত্স হচ্ছে এই পদার্থ। যদিও মাটিতে কোনো বিষাক্ত পদার্থ থাকলে নাইট্রোজেন তা দূর করে থাকে। মাটির উত্কর্ষ বা গুণগতমান ঠিক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাটির উপাদান ঠিক না থাকলে মাটির গুণগতমানও ঠিক থাকে না। পৃথিবীর ১০ ভাগেরও কম ভূমি চাষাবাদের অন্তর্গত। বাংলাদেশে মোট জমির প্রায় ৫২ ভাগ এলাকায় চাষাবাদ হয়। এই অল্প পরিমাণ ভূমিও আমরা পরিকল্পিত ব্যবহার ও চাষাবাদ করতে পারছি না! বিভিন্নভাবে মাটির দূষণ ঘটছে, মাটির ক্ষয় হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে মাটি সংরক্ষণ করতে না পারলে সেই মাটি থেকে সুফল পাওয়া যায় না। শুধু প্রাকৃতিক কারণে শিলা-খনিজের চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ায় মাটি ক্ষয় নয়, মাটির উর্বরতাশক্তি নষ্টও এক ধরনের মাটি ক্ষয়। প্রাকৃতিকভাবে মাটি ক্ষয় সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে—১. স্বাভাবিক বা ভূতাত্ত্বিক মাটি ক্ষয় এবং ২. ত্বরান্বিত মাটি বা ভূমি ক্ষয়। এছাড়া মানুষের নানাবিধ কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে মাটি ক্ষয় হচ্ছে। সজীব ও অজীব দূষক দ্বারা মাটির দূষণ ঘটছে। জীবসংক্রান্ত দূষণ, পরিপোষক দূষণ, অজৈব পদার্থজনিত দূষণ, জৈব পদার্থজনিত দূষণ, অ্যাসিড দূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ, তেজস্ক্রিয় দূষণ, বর্জ্যের দূষণ, কীটনাশক দূষণ ইত্যাদি। শিল্পকারখানার কঠিন বর্জ্যের কারণে মাটি ব্যাপকভাবে দূষিত হয়ে থাকে।
মাটি দূষণ ও ক্ষয়ের প্রভাব মানবজীবনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কেননা আমাদের খাদ্য উত্পাদন, জীবনাচরণ ও বেঁচে থাকা কোনো না কোনো ভাবে মাটির ওপরই নির্ভরশীল। মাটি দূষিত হলে তার প্রভাব মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকোষে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভারী ধাতুর (পারদ, সীসা, ক্যাডমিয়াম) বিষক্রিয়ার প্রভাব মস্তিষ্কের কোষের বিনাশ ও রক্তচাপ বাড়ায়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্তিকার অপসারণে মৃত্তিকা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আবাসস্থলও ধ্বংস হচ্ছে। মাটির উত্কর্ষ বৃদ্ধির জন্য মাটিদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও মাটির ক্ষয়রোধ করে মাটি সংরক্ষণ করা দরকার। এতে খাদ্য উত্পাদনের ভারসাম্য থাকার পাশাপাশি মানুষ স্বাস্থ্যগত সুফলও পাবে।
বাংলাদেশে প্রায় ২৫ ধরনেরও বেশি মাটি দেখা যায়। এক এলাকার মাটি ক্ষয় ও দূষণ অন্য এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বায়ুদূষণ ও পানিদূষণের থেকে ভয়াবহ হচ্ছে মাটিদূষণ। কঠিন বর্জ্য মাটিদূষণের প্রধানতম কারণগুলোর একটি। প্রধানত তিনটি উপায়ে মাটিদূষণ রোধ করা সম্ভব—১. আইন প্রয়োগ করে, ২. প্রযুক্তিগত উপায়ে এবং ৩. ব্যক্তিগত উপায়ে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্লাস্টিক-পলিথিনসহ কঠিন বর্জ্যের ব্যবহার কমানো সম্ভব। প্রযুক্তিগত উপায়ে কঠিন বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ করে তা রিসাইক্লিং বা প্রক্রিয়াজাত করে মাটির দূষণ যেমন রোধ করা সম্ভব তেমনি রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সার, বিদ্যুত্সহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করার মাধ্যমে বর্জ্য সম্পদে পরিণত করা যায়। শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে দূষণ রোধ করা সম্ভব। অবিশ্লেষ্য পদার্থ যেমন পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি এর রিসাইক্লিং প্রায় প্রতিটি দেশে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই। বিশ্বে প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় দ্রব্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অতঃপর রিসাইক্লিং করা হয়। যশোরে শহরের বর্জ্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তারপর তা থেকে জৈবসার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হচ্ছে। দূষণ রোধ করে বর্জ্য, প্লাস্টিক-পলিথিন সম্পদে পরিণত করার প্রয়াসকে এগিয়ে নিলে মাটি দূষণসহ সব ধরনের দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে।
ঢাকা
