দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে চলমান সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও সহিংসতার অবসানের জন্য নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ১২টি ছাত্র সংগঠনের এই জোট গঠনের ঘোষণা দেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। জোটের নেতারা বলছেন, ‘সন্ত্রাস-দখলদারিমুক্ত নিরাপদ গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস’ প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই জোট গঠন করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গন ও ছাত্র সমাজের স্বার্থে আন্দোলনকারী গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ১২টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ ভুক্ত সংগঠনগুলো হলো—বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী), বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন (সাকি), বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন (উমর), বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, নাগরিক ছাত্র ঐক্য, স্বতন্ত্র জোট এবং ছাত্রমঞ্চ। জোটের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে আজ শনিবার বিকাল তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে সন্ত্রাসবিরোধী গণপদযাত্রা করবে সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রঐক্য?
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা ছাত্রদের জোর করে মিছিল-মিটিংয়ে নিয়ে যায়। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের দখলদারিত্ব চলছে। ক্যাম্পাসে যেন কেউ আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড না চালাতে পারে তা নিশ্চিত করাই আমাদের এই জোটের উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে চলমান সন্ত্রাস দখলদারিত্ব ও সহিংসতার অবসানের জন্য ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গন ও ছাত্র সমাজের স্বার্থে আন্দোলনকারী গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ১২টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করছে। সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করবে নবগঠিত ঐক্য।
সংবাদ সম্মেলনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয় বলেন, গত ২২ ডিসেম্বর ডাকসু ভিপির ওপর এক ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ এবং তার ছায়া সংগঠন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। প্রশাসনের মদত ছাড়া এই হামলা কখনো সম্ভব না। এর জন্য দায়ী প্রক্টরের পদত্যাগ আর ভিসির অপসারণের জোর দাবি জানাচ্ছি। সময় এখন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। দখলদারিত্ব নির্মূল করতে হবে। আমরা ১২ ছাত্রসংগঠন আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। ছাত্রদলকে এই সংগঠনে রাখা হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রদলের অতীত ইতিহাস ভালো না। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সবকিছু বিবেচনায় আমরা ছাত্রদলকে এই সংগঠনের বাইরে রেখেছি।
এ সময় জোটের পক্ষ থেকে চারটি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ সকল শিক্ষার্থীর ওপর হামলাকারীদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, আইনানুগ বিচার ও ব্যর্থতার দায়ে প্রক্টরকে অপসারণ, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও আহতদের চিকিত্সার ব্যয়ভার প্রশাসনকে বহন করতে হবে, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং হলে হলে দখলদারিত্ব, গেস্টরুম-গণরুম নির্যাতন বন্ধ করা।
প্রসঙ্গত, ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাবিসহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলো ছাড়াও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আসছে। ১২ ছাত্র সংগঠনের এই মোর্চা গঠনের ফলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ এবং আন্দোলন আরো বেগবান হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
গতকাল মধুর ক্যান্টিনে জোটের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন: ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মেহেদী হাসান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্কসবাদী) সভাপতি মাসুদ রানা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবীর, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা, ঢাবি শামসুন নাহার হল সংসদের ভিপি শেখ তাসনীম আফরোজ প্রমুখ।
বিক্ষোভ মিছিল: এদিকে বিকেল ৪টায় ভিপি নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। মিছিলটি শাহবাগ জাদুঘরের সামনে থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক ও ভিপি নুরুল হকের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা আখতার হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিরোধী মতের চর্চা করতে গেলেই হামলা মামলার শিকার হতে হয়। এসব হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রণোদনা দিয়ে যায়। আগামীতে এ ধরনের হামলা করা হলে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর জবাব দিয়ে ছাড়বে।’
সমাবেশে ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউতে চিকিত্সাধীন ছাত্রলীগের হামলায় আহত এবিএম সুহেলের মা তার ছেলের ওপর হামলার বিচার চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। এসময় সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, ‘আজ সরকারের বিরুদ্ধে আমরা সমালোচনা করছি। ভারতে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে, তখনো আমরা প্রতিবাদ করেছি। আমাদের ওপর তখনো হামলা করা হয়েছিল। আমাদের এসে বলা হয়েছে, ভারত নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। স্বাধীন দেশে বসবাস করে আমাদের এখনো একথা শুনতে হয়। আমরা শুধু ভারত নয়, পৃথিবীর যে কোনো দেশে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে করব। আমাদের হামলা মামলা দিয়ে ঠেকানো যাবে না।’
