চট্টগ্রামে নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে বায়ুদূষণ

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৩২

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে বায়ুদূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্রমাগত বায়ুদূষণের কারণে নগরীতে বসবাসকারী ৬০ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে শিশু, নারী ও বয়োবৃদ্ধরা রয়েছেন সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে। বায়ুদূষণের কারণে হাঁপানি, অ্যাজমা, জন্ডিস, ক্যানসার রোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর মেধা বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পৃথক বরাদ্দ না থাকা ও তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করা, বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও যানবাহনে কালো ধোঁয়া নির্গমন, শিল্প বর্জ্য, পাহাড় কাটা ও ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে প্রতিনিয়ত শহরের বায়ু দূষিত হচ্ছে।

বায়ুদূষণ সারা বছর জুড়ে চললেও শীতকালে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখার বিধান থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর শুধু নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মানছে না খোদ সরকারি সংস্থাগুলো। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, টিএন্ডটি, কর্ণফুলী গ্যাস ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ঠিকাদাররা পরিবেশ আইন উপেক্ষা করে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো নগরবাসীকে। বায়ুদূষণের ফলে বসবাস অযোগ্য নগরীর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চট্টগ্রামের নাম উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামের বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বস্তুকণার উপস্থিতি মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম মহানগরীর বেশ কিছু এলাকায় বাতাসে ক্ষতিকর বস্তুকণার উপস্থিতি ব্যাপক বেড়ে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-হাঁচি-কাশি, হাঁপানি, ফুসফুসের অসুস্থতা নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। নগর জুড়ে খোঁড়াখুঁড়িতে সৃষ্ট ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু কিছু এলাকায় পানি ছিটানো হলেও দূষণের উেসর দিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ ও পরিবেশ প্রশাসনের নির্লিপ্ততার সুযোগ নিয়ে অবাধে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দরনগরীতে মূলত দুটি উত্স থেকে বায়ুদূষণ ঘটছে। এগুলো হচ্ছে : শিল্প-কারখানাসমূহ থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া। এছাড়া পোশাক, রুটি ও বিস্কুট কারখানা, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্প, সিমেন্ট কারখানা, মেটাল ওয়ার্কশপ, করাত কল প্রভৃতি শিল্প-কারখানা বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে। বিভিন্ন কলকারখানায় দূষিত বর্জ্য রোধে ইটিপি মেশিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। শীতের মৌসুমে বৃষ্টির স্বল্পতা থাকায় বাতাসে ধুলার পরিমাণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে জনবহুল এই নগরে বিপুল সংখ্যক যান চলাচলের কারণে ধুলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি বাড়ছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট ধুলাবালি বায়ুদূষণে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে।

অন্যদিকে নগরীতে খাল, পুকুর, ছোটো বড়ো জলাশয়গুলো ভরাট করে শিল্প-কারখানা, দোকানপাট গড়ে তোলার কারণে বায়ুদূষণ রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নীরবে চলছে পাহাড় কাটা। নির্বিচারে গাছপালা কেটে বনজঙ্গল উজাড় করে ফেলা হচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য না থাকায় ধুলাবালি বেড়ে চলেছে। বায়ুদূষণ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, গ্যাস কোম্পানিগুলো, বিদ্যুত্ বিভাগ, বিআরটিএ এবং পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।