২৮ ডিসেম্বর বিশ্বের দৈনিক পত্রিকাগুলোর শীর্ষ খবরের মধ্যে দুটি খবর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বিশ্বব্যবস্থায় নয়া মেরুকরণের গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামক ও নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে বলে আমার ধারণা। আলজাজিরা ও রয়টার্স সূত্রে জানা যায়, অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে জাপানি জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাপানি যুদ্ধজাহাজ ও টহল বিমান ওমান উপসাগর, উত্তর আরব সাগর ও এডেন উপসাগর অঞ্চলে টহল দেবে। আর প্রেস টিভি ও স্পুটনিক নিউজ বরাতে ভারত মহাসাগরে ও ওমান উপসাগরে রাশিয়া-চীন-ইরানের যৌথ নৌমহড়া শুরুর খবরটি প্রচারিত হয়। এ যৌথ মহড়ার তিনটি লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে : (ক) আঞ্চলিক নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, (খ) রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সামরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করা এবং (গ) সন্ত্রাসবাদ দমন করা ও জলদস্যু মোকাবিলা করা।
যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন, তারা জানেন যে সমকালীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কল্পনা করা যায় না। অর্থাত্ মধ্যপ্রাচ্যকে আবর্তিত করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তথা বিশ্বব্যবস্থা নির্ণীত, নির্ধারিত ও পুনঃ মেরুকৃত হচ্ছে।
গত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য বিশ্বকে মধ্যপ্রাচ্য তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে মোড়লের ভূমিকায় স্থাপিত করে, তা সাম্প্রতিক কালে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভূমিকায় অত্রাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্যকে খর্ব করেছে মারাত্মকভাবে। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে আস্থায় আনতে পারে না। স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে একমেরু বিশ্বব্যবস্থার যে প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থায় বিরাজ করতে দেখেছিল, সে সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বব্যবস্থায় জোরজবরদস্তির স্পর্ধা দেখাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি ও বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্বের আসনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ করতে নানাবিধ উচ্চাভিলাষী রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রভাব-বলয় ছিঁড়ে ফেলতে চীন, রাশিয়া, ইরান নতুন একটি বিশ্বজোট হিসেবে ইতিমধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এ জোটের সহায়ক শক্তি হিসেবে তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার, উত্তর কোরিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার মার্কিনবিরোধী রাষ্ট্রসমূহ সক্রিয় থাকছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের পাশ্চাত্য জোট বিশ্বময় যে দখল তত্ত্বের (hegemonic stability theory) ভঙ্গুর ক্ষণস্থায়ী বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল, তা তাসের ঘরের মতো খানখান হতে চলেছে। ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব্বে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান থেকে চ্যুত হয়ে, জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী প্রতিষ্ঠায় সম্মতি দিয়ে জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরিয়ে নিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের অবৈধ কার্যাবলি বিশেষত ফিলিস্তিনি জনগণের পৈতৃক ভিটাবাড়ি দখল করে ইসরাইলের বসতি নির্মাণে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব, তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতির দীর্ঘ আস্থাময় অবস্থান থেকে ছিটকে পড়ছে। এই শূন্যতা পূরণে নয়া বিশ্বজোটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা বিশ্বের রাজনৈতিক অবস্থা ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বে যুগান্তকারী পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা নিয়ে সমাগত।
বিশ্বরাজনীতির চ্যালেঞ্জ-সংকুল রাজপথে নব-উত্থিত শক্তিজোটের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য জোট হুমকি-ধমকির কৌশল অবলম্বন করে হার্ডলাইনে গেলে নিয়ত-অস্থিতিশীল এ বিশ্বব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। বিশ্বের ক্ষমতা এখন আর দ্বিচাকায় ঘুরছে না, দ্বিমেরুতে অবস্থান করছে না বরং বিশ্বক্ষমতা বিভাজিত হয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে এবং এমন এক জটিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপান্তরিত শিলায় পরিণত হয়েছে, যা জীর্ণ করা, ছেদ করা খুব সহজ নয়। একসময়কার অখ্যাত, অথর্ব উত্তর কোরিয়া তাই এখন পারমাণবিক অস্ত্রের ঝনঝনানির স্পর্ধা দেখাতে তত্পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক রক্তচক্ষু উপড়ে ফেলতে পালটা পারমাণবিক হুমকির জাল বিস্তার করে চলেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃতি ও বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বময় একক আধিপত্য দেখানোর সেকেলে, অর্বাচীন কৌশল বিশ্ববাস্তবতায় প্রত্যাখ্যাত হতে বাধ্য। পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন কৌশল অনুসরণ করে সমমর্যাদা, সম অধিকার ও সমতার ভিত্তিতে প্রাঞ্জল, স্বচ্ছ, সৃষ্টিশীল ও সৃজন-নির্ঝর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতির প্রভাতে উদিত হয়েছে, যার সোনালি আলোকরশ্মি বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করছে। বিশ্বের বৃহত্ শক্তিসমূহকে এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমসাময়িক ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া ও আন্তঃক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
এ বাস্তবতা বিস্মৃত হয়ে বৃহত্ শক্তিবর্গের খামখেয়ালি, হঠকারী ও অসতর্ক পদক্ষেপ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিশাপ ডেকে আনতে পারে। আগেই উল্লেখ করেছি যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বিশ্বনেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়েছে এবং বিশ্বময় আস্থা হারিয়েছে। দেশটির পরীক্ষিত মিত্র জাপানের মধ্যপ্রাচ্য মহড়া এমনি আস্থা-সংকটের বিষয়টি পরিষ্কার করে প্রমাণ করছে। একসময় জাপানসহ অন্য মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা লক্ষণীয় নয়। জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োশিহিদে সুগা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে জাপানি জাহাজের নিরাপত্তাসহ আন্তর্জাতিক সমৃদ্ধি ও শান্তির জন্য জাপানি টহলের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন এবং জাপানের এ পদক্ষেপে ইরানকে ক্ষুব্ধ না করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য বজায় রাখতে যে কোনো জাপানি ভূমিকার প্রতি ইরানের সমর্থন আদায়ের কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন। গত সপ্তাহে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির টোকিও সফরকালে জাপানি টহল পরিকল্পনার কথা তাকে জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের চিরায়ত শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সম্মতিতে জাপানি টহল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের নিরাপত্তা আস্থার ক্ষয়িষ্ণুতা ও ভঙ্গুরতার ইঙ্গিতবহ।
রাশিয়া ও চীনের অব্যাহত মহড়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে ত্রিশক্তির মধ্যপ্রাচ্য-মহড়া ইরানের উদীয়মান শক্তিমানতার প্রমাণ বহন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে এ বার্তা দেয় যে ইরানকে শায়েস্তা করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি-ইসরাইলি মৈত্রী জোট বিনা চ্যালেঞ্জে এক পা-ও এগোতে পারবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যিক মিত্র ইউরোপীয় সংঘের (ইইউ) ক্ষয়িষ্ণু বৈশিষ্ট্য পাশ্চাত্য শক্তির বৈশ্বিক নেতৃত্বে স্থায়ী ফাটল ধরাচ্ছে বলে অনুমিত হচ্ছে। নানা বৈশ্বিক ইস্যু, যেমন—শরণার্থী, ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, জলবায়ু, সন্ত্রাস, বিশ্ববাণিজ্য প্রভৃতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্রান্স, জার্মানিসহ অন্যান্য পুঁজিবাদী পশ্চিম ইউরোপীয় দেশসমূহের প্রকাশ্য বিরোধিতা দেদীপ্যমান। হরমুজ প্রণালি সন্নিকটে অবস্থিত ওমান উপসাগরের সংবেদনশীল নৌসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ত্রিদেশীয় নৌমহড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বে চীন ও রাশিয়া এ দুটি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের ইরান-সমর্থনের স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, অত্রাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দখলতত্ত্বের দিন ফুরিয়ে গেছে এবং ইরান অত্রাঞ্চলে বৃহত্ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র কর্তৃক সুদৃঢ়কৃত ও স্বীকৃত হচ্ছে। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চিরমিত্র হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের অব্যাহত বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মিত্রতার নবযাত্রার প্রণোদনা, যা সৌদি আরবে অনুষ্ঠেয় আসন্ন জি-২০ সম্মেলনে চীনের অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দ্বারা অনুপ্রাণিত, তা এ বার্তাও বহন করছে যে, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূর্ণ করলে সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যে কোনো সময় সৌদি-চীন সম্পর্ক দ্বারা প্রতিস্থাপিত করাও সম্ভব।
ত্রিদেশীয় নৌমহড়ার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় আন্তর্জাতিক নৌসীমা, প্রণালিগুলোর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জাহাজসমূহের নিরাপত্তায় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করবে। ত্রিদেশীয় নৌমহড়ার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য মহড়ার প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে বৈশ্বিক বৃহত্ শক্তিবর্গের আন্তঃক্রিয়ার যে ভয়ংকর ভবিষ্যত্ চিত্র অঙ্কন করছে তা সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার নয়া মেরুকরণের স্পষ্ট অধ্যায় লিপিবদ্ধ করছে। সংযত ও সতর্কভাবে নিরাপত্তানীতি ও সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে। এখানে যে কোনো ভ্রান্তনীতি, খেয়ালি পদক্ষেপ, দখলতত্ত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় ধ্বংস ডেকে আনতে পারে এবং বিশ্বব্যবস্থাকে উলটে দিতে পারে। অত্রাঞ্চলে যে কোনো একটি ফাঁকা গুলিও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে এবং পৃথিবী নামক গ্রহের চিরবিনাশ ঘটাতে পারে।
n লেখক :প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল [email protected]

