সৃজন ডাঁটায় চলচ্চিত্রের অপূর্ব ফুল

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০৭

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন পৃথিবীর সবার কাছে আর্ট বা একাডেমিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ফরিদপুরবাসীর কাছে তিনি ঘরের মানুষ। ১৯৯১ সালে সস্ত্রীক ফরিদপুর ঘুরে যাওয়ার পর থেকে তিনি আরো কাছের হয়ে উঠেছেন। ফরিদপুরে তার অবস্থানকালীন একটা দিন এখনো অনেকেরই স্মৃতির তহবিলে সোনার দিরহামের মতো জমা হয়ে আছে। ’৯১-এর ২০ জানুয়ারির পর থেকে ঝিলটুলীর বাচ্চু কমিশনারের ধূসর-বিবর্ণ পলেস্তারা জমা পুরোনো বাড়িটির গায়ে মুগ্ধতা আর বিস্ময়ের পরাগ জমতে থাকে। গত বছর ১৪ মে মৃণাল সেনের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর পরিবারের কয়েকজন সম্মানিত সদস্য কলকাতা থেকে ফরিদপুরে আসেন। উঠোন পত্রিকা এবং বাচ্চু কমিশনারের পরিবারের পক্ষ থেকে জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরান খুলে আদরমাখা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান শেষে কলকাতার অতিথিরা পুরোনো পৈতৃক বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখেন। হাত দিয়ে বসতবাড়ির দেওয়াল ছুঁয়ে যেন তারা বাবা-কাকা-ঠাকুরদার গায়েই আদর বুলাচ্ছিলেন!

এসব ঘটনা পরম্পরার অভিঘাতে ঋত্বিক-সত্যজিত্-সুচিত্রা সেন থেকে মৃণাল সেনের আবেশ ফরিদপুরবাসীর কাছে একদমই আলাদা। ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল মৃণাল সেন ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত তিনি ফরিদপুরেই পড়াশোনা করেন। ফরিদপুরের সিনেমা হলেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। এমনকি তার বিচারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার চার্লি চ্যাপলিনের ছবিও তিনি ফরিদপুরে দেখেন। সিনেমায় শব্দ ব্যবহারের গুরুত্বটাও তিনি ফরিদপুরের সিনেমা হলে বসেই প্রথম উপলব্ধি করেন। রাজনীতি-সচেতন আইনজীবী পিতা দীনেশ সেনের কাছ থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার পাঠ গ্রহণ করেন। মা, বড়োভাইসহ পরিবারের অন্যদের এভাবে ক্রমশ তিনি উদার অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ সাম্যবাদী মানসিকতায় দীক্ষিত হয়ে ওঠেন।

ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চল্লিশের দশকের গোড়ায় কলকাতায় চলে যান বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে। কয়েক বছর পর বাড়ি বিক্রি করে গোটা পরিবারই চলে যায় কলকাতায়। তখনকার রাজধানী শহর কলকাতা মৃণাল সেনের চোখ-কান খুলে দেয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ—সব মিলে একটা টালমাটাল সময়ের ঘূর্ণিপাকে পড়ে যান মৃণাল সেন। কলকাতার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে বিশ্বসাহিত্যের রথী-মহারথীদের বইপত্র পড়ে মুক্ত-শানিত অনাবিল এক পুনর্জন্ম লাভ করেন মৃণাল সেন। এই লাইব্রেরিতেই একদিন তার হাতে আসে রুডলফ আর্ন হেইমের লেখা ‘ফিল্ম’ বইটি। এই বইয়েই তার পরবর্তী জীবনের দিগদর্শী চুম্বক হয়ে ওঠে।

বাংলাসহ ভারতের আটটি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ওড়িয়ায় মাটির মনিষ, তেলেগুতে ওকা উরি কথা, হিন্দিতে ভুবন সোম, এক আধুরি কাহিনী, মৃগয়া, খন্ডহর, জেনেসিস, একদিন আচানক। প্রধানত বাংলার প্রতিনিধিত্ব করলেও তার চলচ্চিত্র ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির বোধে ঋদ্ধ। চলচ্চিত্রে ভিয়েতনাম বা লাতিন আমেরিকায় যুদ্ধের প্রামাণ্য ছবি ব্যবহার করেছেন নানা সময়ে।  মৃণাল সেনের ছবির মূল বিষয় ‘দারিদ্র্য’ আর ‘শোষণ’। গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকের কলকাতা কিংবা তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অনবরত উঠে এসেছে তার অনেক ছবিতে। আকাশ-কুসুম, ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১, পদাতিক, কোরাস-এর মতো সাদাকালো ছবিতে মৃণাল সেন বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের গল্পগুলো তুলে এনেছেন। পাশাপাশি এনেছেন নকশাল আন্দোলন থেকে বাম আন্দোলনের শক্তি ও দুর্বলতার ইতিহাস।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র জগতে আসা বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। মৃণাল সেন বলতেন, ‘ক্ষুধাই পারে মধ্যবিত্তকে ঘর থেকে বেরিয়ে তীব্র দ্রোহের রাজনীতির পথে টেনে আনতে।’ এক্ষেত্রে তার শুধু ১৯৪৩-এর মন্বন্তর নয়, ষাট আর সত্তরের দশকে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে যে মর্মান্তিক খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছিল, তা উঠে এসেছে বাইশে শ্রাবণ, কলকাতা ৭১, মাটির মনিষ, অকালের সন্ধানে চলচ্চিত্রগুলোতে। মৃণাল সেন এমন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন, যিনি সব কটি বড়ো চলচ্চিত্র উত্সব থেকে পুরস্কার জয় করেছেন। ১৯৮১ সালে তিনি পদ্মভূষণ, ২০০৫ সালে দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার পান। ভারতীয় সংসদের সান্মানিক সদস্য পদে ছিলেন ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত। ফরাসি সরকার তাঁকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ সম্মানে সম্মানিত করে। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁকে ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’ সম্মানে ভূষিত করেন। চলচ্চিত্র চর্চার পাশাপাশি লেখালেখিতেও নিয়মিত ছিলেন মৃণাল সেন। জনৈকের জীবনচরিত, ভিউজ অব সিনেমা, অলওয়েজ বিং বর্ণ তার আলোচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৩ সালে চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন মৃণাল সেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। মৃণাল অর্থ পদ্মের ডাঁটা। মৃণাল সেন তাঁর সৃজন ডাঁটায় ফুটিয়েছেন চলচ্চিত্রের অপূর্ব সব ফুল। 

n লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক