খুলনায় মোটা অঙ্কের মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বেসরকারি চারটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, এহসান সোসাইটি, চলন্তিকা যুব সোসাইটি ও সেফ ইসলামী গ্রুপ লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠান চারটিতে সঞ্চয়কৃত অর্থ ফেরত না পেয়ে হাজার হাজার গ্রাহক পথে বসেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও অর্থ ফেরত না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুঁইফোড় এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতারিত হওয়া মানুষ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে ‘এহসান সোসাইটি’ নামের এই প্রতিষ্ঠান খুলনাঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করে। নগরীর শেরেবাংলা রোডে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ছিলেন নগরীর দারুল উলুম মাদ্রাসার বহিষ্কৃত শিক্ষক মুফতি গোলাম রহমান এবং জেলা সমন্বয়কারী ছিলেন ডালমিল মোড়ের মক্কি মসজিদের ইমাম মুফতি রশিদ আহমাদ। খুলনা শাখার ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন গোলাম রহমানের ভাগনে রবিউল ইসলাম। এরা নগরীর বিভিন্ন মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের ডেকে ইসলামি অর্থনীতির দোহাই দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহে প্রলোভন দেখান। তাদের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়ে সহজ-সরল ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মাদ্রাসার শিক্ষকেরা গ্রাহকদের বুঝিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ করে কোটি কোটি টাকা জমা করান। এহসান সোসাইটির নামে ২০১৪ সাল পর্যন্ত শুধু মহানগরী ও দীঘলিয়া উপজেলা থেকেই সংগ্রহ করা হয় ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রথম দিকে গ্রাহকদের কিছু কিছু লভ্যাংশ পরিশোধ করা হলেও ২০১৪ সালে এই টাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতারণা বুঝতে পেরে গ্রাহকেরা তাদের অর্থ ফেরত চাইলে মুফতি গোলাম রহমান ও রশিদ আহমাদ নানা টালবাহানা শুরু করেন। এ ঘটনায় ছয় জন গ্রাহকের সাড়ে ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সোসাইটির দীঘলিয়া থানা সমন্বয়কারী মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন বাদী হয়ে তিন জনকে আসামি করে ২০১৭ সালের ১৯ জুন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় সংস্থার কেন্দ্রীয় শরিয়াহ কাউন্সিলের সহ-সেক্রেটারি ও খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মুফতি গোলাম রহমান, জেলা সমন্বয়কারী ইমাম মুফতি রশিদ আহমাদ এবং ম্যানেজার রবিউল ইসলামকে আসামি করা হয়। এছাড়া মাঠকর্মী মাওলানা আবুজর বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে আরো দুটি মামলা দায়ের করেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩ নম্বর আদালতের বিচারক মো. শাহিদুল ইসলাম এ দুটি মামলার রায়ে আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা প্রদান করেন। এর মধ্যে মুফতি গোলাম রহমান ও রবিউল ইসলাম পলাতক এবং মুফতি রশিদ আহমাদ আপিলের শর্তে আদালত থেকে এক মাসের জামিন লাভ করেন।
মামলা দুটির বাদী মাঠকর্মী মাওলানা আবুজর বলেন, মামলার রায় হলেও আসামিরা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
এদিকে, ২০০৪ সালে খুলনাসহ আশপাশের জেলায় কার্যক্রম শুরু করে ‘চলন্তিকা যুব সোসাইটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সোসাইটির চেয়ারম্যান মো. খবিরুজ্জামান ও নির্বাহী পরিচালক মো. সরোয়ার হুসাইন নগরীর জিরো পয়েন্টে নিজস্ব বহুতল ভবনসহ আশপাশের জেলা-উপজেলায় জমি ক্রয় ও শাখা অফিস ভবন নির্মাণের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেন। শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি প্রদানসহ নানা ধরনের সামাজিক কাজেও অংশ নিত এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০১৭ সালের শেষের দিকে হঠাত্ করেই এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা আত্মসাত্ করে আত্মগোপন করেন। বন্ধ হয়ে যায় প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শাখা অফিসগুলো। এতে শত শত গ্রাহক দিশেহারা হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার গ্রাহকেরা আদালতে ও থানায় মামলা করতে শুরু করেন। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, এমডিসহ অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় ৪৭টি মামলা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. খবিরুজ্জামান ও নির্বাহী পরিচালক মো. সরোয়ার হোসাইন কারাগারে রয়েছেন।
এছাড়া চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর খুলনার সেফ ইসলামী গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেফ ইসলামী ব্যবসায়ী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা আত্মসাত্ করে আত্মগোপনে গেছেন কর্মকর্তারা। গত ২৮ নভেম্বর ১২২ জন গ্রাহক আদালতে এই প্রতিষ্ঠানের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপরে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মামলা দায়ের করেন। ১২২ জন গ্রাহকের ১০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলেও আর্জিতে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের এবং এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে কেন নিষিধাজ্ঞা দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে আদালত। গত ২ ডিসেম্বর খুলনার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মো. আশরাফ উদ্দিন এ আদেশ দেন।
অপরদিকে ২০১০ সালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আব্দুল মান্নান তালুকদার স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে শহরের মিঠাপুকুরপাড়ে নিউ বসুন্ধরা রিয়েল স্টেট লিমিটেড নামে একটি জমি কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ঐ প্রতিষ্ঠানে তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান করা হয় মিঠাপুকুরপাড় জামে মসজিদের ইমাম আনিসুর রহমানকে। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার পর তিনি গ্রাহকদের প্রতি লাখে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রলোভনে বাগেরহাট, খুলনাসহ বেশ কয়েকটি জেলার প্রায় ২০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত ২৯৯ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেন। গত কয়েক বছরে বাগেরহাটের ১৬টি ব্যাংকের ৩০টি হিসাব থেকে তিনি ১১০ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ১৩৫ টাকা ৫৮ পয়সা জমা করেন। পরে গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি ব্যাংক থেকে তুলে পাচার করেন। দুদকের টাকা পাচার মামলায় নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমানকে গত ৬ আগস্ট বাগেরহাটের মুখ্য বিচারিক হাকিম স্বপন কুমার সরকার কারাগারে পাঠান। আদালতে আনিসুর রহমান আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। মামলার অন্য আসামি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল মান্নান তালুকদার গত ১৫ জুলাই একই আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে তাকে কারাগারে পাঠান আদালত।
