আল জাজিরা
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। তিনি ইরানের বিশেষ বাহিনী রেভ্যলুশনারি গার্ডের অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন। বিগত বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক প্রভাব বিস্তারে বারবারই তার নাম আলোচনায় এসেছে। কাসেম সোলাইমানি একজন নিভৃতচারী অথচ ক্ষমতাধর জেনারেল ছিলেন।
সোলেইমানির উঠে আসা ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কেরমান প্রদেশের একটি দরিদ্র পরিবার থেকে। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময় তরুণ সোলাইমানি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মাত্র ছয় সপ্তাহ সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ না করতেই ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশে প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হয় তাকে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) সময় সীমান্তে বীরোচিত ভূমিকার জন্য ‘জাতীয় বীর’ বনে যান সোলাইমানি। এরপর সামরিক বাহিনীতে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম আস্থাভাজন জেনারেল। এই আস্থাভাজন জেনারেলের হাতে ১৯৯৮ সালে তুলে দেওয়া হয় বিপ্লবী গার্ডের প্রধানের দায়িত্ব। তারপর অনেকটা নিভৃতে তিনি কাজ করতে থাকেন। তার কৌশলের কারণে লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগত বাহিনী এবং ইরাকের শিয়াপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জোরদার সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইরানের।
সোলাইমানির কুদস বাহিনী সাম্প্র্রতিক সময়ে ইরান সীমানার বাইরে কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফলতার পরিচয় দিয়েছে সিরিয়া এবং ইরাকে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে সরকার গঠিত হলে সেই সময় দেশটিতে ইরানের প্রভাব বাড়াতে তত্পর হন সোলেইমানি। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ যখন গৃহযুদ্ধের কারণে পতনের দ্বারপ্রান্তে, তখন সোলাইমানির নেতৃত্বে তার বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলী ভূমিকা নেয়, এই ভূমিকার কাছে হেরে যায় আসাদবিরোদী সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এছাড়া ইরাকে এবং সিরিয়ার বিশাল অংশে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস দমনে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পাশাপাশি সোলাইমানির বাহিনীও রাখে বড়ো ভূমিকা।
দীর্ঘদিন নিভৃতে কাজ করলেও সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্য শিয়া নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে দেখা যেতে থাকে। খামেনি জেনারেল সোলাইমানিকে ‘অর্ডার অব জুলফিকার’ পদক দেন। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে এ পদক তিনিই প্রথম পান। বিগত বছরগুলোতে ইরানের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
যখন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সোলাইমানির প্রভাব চোখে পড়তে থাকে, তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরবের টার্গেটে পরিণত হন তিনি। গত ২০ বছরে বহুবার হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন তিনি। কখনো ইরানের ভেতরের শক্তির সহায়তায়, কখনো ভাড়াটে খুনির সহায়তায় এ চেষ্টা চালানো হয়। ২০০৬ সালে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার পাশাপাশি তিনিও প্রাণ হারান বলে খবর ছড়ায়। এরপর ২০১২ সালে বাশার আল-আসাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর বোমা হামলায় সোলাইমানিও নিহত হন বলে দাবি করা হয়। ২০১৫ সালে আলেপ্পোয় বাশার আল-আসাদ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধের সময় সোলেইমানি নিহত বা গুরুতর আহত হন বলেও খবর ছড়ায়। প্রতিবারই দেখা গেছে, এই তিনি বেঁচে আছেন। অবশেষে গতকাল শুক্রবার মার্কিন হামলায় নিহত হলেন ইরানের ‘জাতীয় বীর’ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি।
