বিশ্বব্যাপী নানান মাত্রার অস্থিরতা ক্রমশ মাকড়সার জালের মতো ছড়াইয়া পড়িতেছে। এই অস্থিরতা হইতে বিশ্বের কোনো দেশই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এখন আর মুক্ত নহে। অত্যন্ত দুঃখের সহিত বলিতে হয়, সবচাইতে অধিক অস্থিরতা ছড়ানো হইতেছে মুসলিমপ্রধান দেশগুলিতে। আমরা দেখিতেছি, সারা বিশ্বে ‘মুসলিম ফোবিয়া’ সামাজিকভাবে এমন পর্যায়ে লইয়া যাওয়া হইতেছে, যাহা অত্যন্ত আপত্তিকর। কী আশ্চর্যের কথা! মুসলিম দেশগুলির বিরুদ্ধেই সবচাইতে বেশি ষড়যন্ত্র হইলেও মুসলিম জাতির পদে পদে জড়াইয়া দেওয়া হইতেছে সন্ত্রাসের তকমা। আমরা দেখিতেছি ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব নব-নবরূপে এবং নূতন স্বীকৃতির মাধ্যমে আরো প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছে। সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়ার মতো রাষ্ট্রে যাহারা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ জাতি, তাহাদের আজ পথের ভিখারি বানানো হইতেছে।
কিন্তু খেলার অনেক বাকি। নয়-এগারোর পর আফগানিস্তানে কথিত সন্ত্রাসদমন শেষে পরাশক্তিদের নিকট এখন সেই ‘দমন’ সবচাইতে বড়ো মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিয়াছে। তাহারা অনেক দিন ধরিয়াই পথ খুঁজিতেছে ঐ ভূখণ্ড হইতে নিজেদের গুটাইয়া লইতে, কিন্তু ইহা যেন চক্রব্যূহের মতো, প্রবেশ করা যায় সহজে বাহির হওয়া যায় না। পরাশক্তিদের পূর্বসূরি জ্ঞানী নেতারা নিশ্চয়ই জানিতেন মুসলমানদের ইতিহাস, আরবদের ইতিহাস। কিন্তু পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত জটিলতা না বুঝিয়া কথায় কথায় মাটির নিচে পুঁতিয়া ফেলিবার হুংকার দেওয়াটা বর্তমান নেতাদের অজ্ঞতাই বলা যায়। মনে রাখিতে হইবে, বিগত চোদ্দো শত বত্সর ধরিয়া মুসলমানদের বিজয়ের ধারা গোলাপ-বিছানো পথে আসে নাই। অন্যদিকে, মুসলমানদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নও কম হয় নাই। কিন্তু সকল কিছুর পরেও ইসলাম তাহার অন্তর্নিহিত অসীম শক্তিমত্তা লইয়াই বহাল তবিয়বে রহিয়াছে। কারবালা হয়, কিন্তু মুসলমান বিনাশ হয় না। কারণ ইসলাম চাহে মানুষের জীবন শান্তি ও নিরাপত্তার সহিত পরিচালিত হউক। এই কারণে আমরা দেখিতে পাই, ইসলামের প্রথম যুগে আরবের পথহারা মানুষগুলি যখন ইসলামের ছায়াতলে আগমন করিল, কেবল তখনই সমাজ-রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র তৈরি হইল। সেই সময় কেবল সিরিয়া, ইয়ারমুক, কাদেসিয়া বা মাদায়েনে শান্তি ও জনগণের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হইল না বরং পৃথিবীর যেখানেই অশান্তি বিরাজ করিতেছিল সেইখানেই ইসলাম হাজির হইতেছিল সৃষ্টিকর্তার রহমত হিসাবে। এইভাবে আমরা দেখিয়াছি জালুলার যুদ্ধ ও হুলওয়ান বিজয়, মোগল আমল, হাজি শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, মাদায়েন বিজয়। সততা এবং ক্ষমাশীলতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছে ইসলাম। ক্ষমাশীলতা ও উদারতার দৃষ্টান্তস্বরূপ উচ্চারণ করা যায় আব্বাসীয় খলিফা মুক্তাফি লি-আমরিল্লাহ ও তাহার পুত্রের কথা।
আমরা জানি, মুসলমানরা এক সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত আর কাহারো নিকট মাথা নত করিতে জানে না। মুসলমানরা এখন যেহেতু জীবন বাঁচাইতে লড়িতেছে, সেই হেতু তাহাদের প্রতিরোধও হইবে তীব্র। সুতরাং কতিপয় পরাশক্তির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও প্রপাগান্ডার কারণে সমগ্র বিশ্বে মুসলিমরা আজ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে যেই সন্ত্রাসের শিকার হইতেছেন, তাহার অবসান ঘটিবে নিশ্চয়ই। মনে রাখিতে হইবে, এই বিশ্ব দানবের তরে নহে, মানবের তরে।
