এই স্বপ্নগুলোর কি খুব বেশি চড়া মূল্য?

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪০

নূরজাহান শিল্পী

 

বাংলাদেশে ফি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কত প্রাণ ঝরে। কত মায়ের বুক খালি হয়। কত নারী স্বামীহারা হন। কত পুরুষ স্ত্রীহারা হন। এসব সংবাদ আমাদের হূদয়ের কড়া নাড়ে। বিদায়ী ২০১৯ সালের হিসাব কষলেই বুঝতে অসুবিধে হবে না—প্রাইভেট কার, বাস ও চালক সবগুলোর চিত্রই যেন এক ও অভিন্ন। তবে আমরা যারা দেশের বাইরে, সেসব দেশের কথা যদি বলি, তাহলে দেখব সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন চিত্র। বলছিলাম বিলেতের কথা। রানির দেশের বাসগুলো রানির মতোই লাল টুকটুকে। বাসগুলো নির্জীব, কথা বলতে পারে না। তারপরও রংগুলো স্বপ্ন এঁকে যায়। বিলেতের বাসগুলো কেন লাল? অনেক দেশ ও রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সরকারি জাতীয় রং হিসাবে একটি সেট গ্রহণ করেছে। সেখানে তালিকার শীর্ষে রয়েছে লাল। স্বভাবতই লাল রং নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। লাল রং আবেগ, বন্ধুত্বপূর্ণ ভালোবাসার প্রতীক।

শুনেছি বিলেতের ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের আগে বাসগুলো ধূসর বর্ণের ছিল। তারপর বাসগুলোকে লাল রঙে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; সেজন্য শিশুরা সহজে রংটা মনে রাখতে পারে। দৃষ্টি আকর্ষণের সবচেয়ে উপযুক্ত রং হয়তো তাই। বিলেতে প্রতিটি শহরে বাস চলাচল ব্যবস্থা স্বপ্নের মতোই মনে হয়। দোতলা বাসগুলো যেন স্বপ্ন ফেরি করা ফেরিওয়ালা।

লাল রঙের বাসগুলো সারি সারি লাইন বাঁধা। দিন রাত ২৪ ঘণ্টায় সচল। আসা-যাওয়া করবে নির্দিষ্ট সময়ে। একটির সঙ্গে অন্যটির সংঘর্ষ নেই, নেই ঠেলাঠেলি। হেল্পারেরও প্রয়োজন নেই। আলাদা সুব্যবস্থা রয়েছে পঙ্গু ও বাচ্চাদেরও। নির্দিষ্ট স্থানে কার্ড রিচার্জ করে নির্দিষ্ট স্থানে বাস দাঁড়াবে, পয়েন্টগুলোর নাম্বার দেওয়া রয়েছে। ভাড়া খাটে মেশিনে। এখানকার বাস ড্রাইভাররা  উচ্চশিক্ষিত। নানা প্রশিক্ষণ পেরিয়ে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের ইউনিফর্মগুলোও অসাধারণ। প্রতিটি ইউনিফর্মই দেখার মতো। একই রঙের নারী কিংবা পুরুষ বাস ড্রাইভার। কেমন জানি একটা ভাবসাব। তাদের চলনেবলনে দৈহিক উচ্চতায়। ভালো লাগে বাসে উঠে সময় কাটানোর জন্য নিউজপেপারগুলো দেখে। তাক তাক সাজানো নিউজপেপার। সঙ্গে ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবস্থা। আর কী চাই?

আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র। রাস্তাঘাটের চিত্র ভয়াবহ! চালকদের যথেষ্ট দক্ষতার অভাব। অধিকাংশ গাড়ির ফিটনেসের নাজুক চিত্র। অথচ সড়কপথে সবচেয়ে বেশি যাত্রী বাসে ভ্রমণ করেন। বাসগুলোর চিত্রও আশানুরূপ নয়। বিলেতের মতো বাসগুলোয় দ্যুতি ছড়ানোর মতো কিছু পরিলক্ষিত হয় না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। লাল বাসগুলো যেন তারুণ্যের স্বপ্ন দ্যুতি ছড়ায়।

এশিয়ার দেশগুলোর বেশিরভাগ বাসের রং লাল। নিউইয়র্কের বাসগুলো হলুদ কেন? এই শিরোনামে একজন লিখেছিলেন, হলুদ রং  ভোলার নয়। শিশুরা সহজে রংটা মনে রাখতে পারে। দার্শনিক রালফ ওয়ালডো এমারসন বলেছিলেন, ‘পথ যে দিকে নিয়ে যায় সেদিকেই যেয়ো না। যেদিকে কোনো পথ নেই সেদিকেই হাঁটো এবং নিজের চিহ্ন রেখে যাও।’ আমি স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশে সবুজের মধ্যে লাল বৃত্ত মোড়ানো স্বপ্নফেরি করা বাসের। স্বপ্ন দেখি সেই দিনের, যেদিন আমাদের মাতৃভূমিতে প্রতিটি শহরে এই রকম বাস চলাচলের সুব্যবস্থা শুরু হবে।

কেউ কেউ বলেন এশিয়া মহাদেশে এরকম হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর বাংলাদেশ সেটা তো অসম্ভব তাচ্ছিল্যভরা কথাগুলো শুনতে মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু অসম্ভব বলে কিছু নেই। বার্নাড শ বলেছিলেন, বেশিরভাগ মানুষ চারপাশের বস্তুগুলো দেখে জিজ্ঞাসা করে কেন? আর আমি যা নেই তা কল্পনা করে বলি কেন এটা বাস্তব হবে না? তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে আমারও একই প্রশ্ন। ডিজিটাল বাংলাদেশে এই স্বপ্নগুলোর কি খুব বেশি চড়া মূল্য?

আমাদের না হয় দেখার সৌভাগ্য হলো না। আমাদের সন্তানরাও না হয় দেখে যেতে পারল না। অন্তত নাতিপুতিরা যেন এমন একটি বাংলাদেশ দেখে। স্বপ্নই পারে কিছু অর্জন দিতে। তাই কখনোই স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা যাবে না। বাসে বসেই স্বপ্ন বুনি। বাংলাদেশের স্বপ্ন।

লন্ডন