আসুন চিন্তাচেতনাকে একটু সংস্কার করি

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪০

সুমী দাশ

 

কুসংস্কারে আবদ্ধ মানুষ বংশের প্রদীপ জ্বালাতে ছেলেসন্তান কামনা করে! সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারযুক্ত এই ধারণাগুলো থেকে মানুষ এখনো বেরিয়ে আসতে পারছে না। বিজ্ঞানের আবিষ্কার জাতিকে যতই উন্নত পর্যায়ে নিয়ে আসুক না কেন, মনের দিক থেকে মানুষ আদৌও এই অশুভ বদ্ধমূল ধারণা থেকে সরে আসতে পারছে না। তাহলে কন্যাসন্তানের স্থান কোথায়?  কন্যাসন্তান জন্ম কি অপরাধ? বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে চিকিত্সাবিজ্ঞানে এমন সব যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে যার সাহায্যে অতি অল্প সময়ে দেহের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফ একটি। এর মাধ্যমে অনেক রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি মেয়েদের গর্ভাবস্থায় সন্তানের বয়স, ওজন, জন্মগত ত্রুটি, অবস্থান, জীবিত না মৃত, সন্তানের সংখ্যা, আবার সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে ইত্যাদি তথ্য জানা যায়।

সবকিছু ঠিক থাকলে সন্তান ছেলে বা মেয়ে হবে কি না সেটা জানার আদৌ কি প্রয়োজন আছে? কেন জানি না সবাই প্রথম সন্তান ছেলেই বেশি কামনা করে। মেয়েদের শ্বশুরবাড়ির লোকজন উদগ্রীব হয়ে থাকে গর্ভের পাঁচ মাস পর আলট্রাসনোতে কোনো সুসংবাদ এবং দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে কি না? সন্তান গর্ভে আসার পর পুরো পরিবারে একটি খুশির আমেজ থাকে। যদি জানা যায় সন্তানটি ছেলে নয় মেয়ে হবে, তখন অনেক পরিবারে যেন অন্ধকার নেমে আসে। কিন্তু ঐ নতুন গর্ভবতী নারীর মানসিক অবস্থার কথা কেউ চিন্তা করে না এবং তার মানসিক চাপের কারণে যে গর্ভের শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় সেটা  কেউ ভাবে না। অথচ একটি কন্যাসন্তানও শুধু বংশে নয়, পুরো বিশ্বে উজ্জ্বল প্রদীপ জ্বালিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারে। আমরা জানি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীর অবদান ছিল যথেষ্ট।

বাংলাদেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের সম্মানিত স্পিকার, বিরোধী দলের নেত্রী সবাই তো নারী। যদিও সমাজ এখনো পিতৃতান্ত্রিক। এদিকে নারীর মধ্যে বেগম রোকেয়া একজন উদ্যমশীল  লেখক, সমাজকর্মী আবার নারীশিক্ষার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ভূমিকা, এভারেস্ট জয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা প্রমুখের কথা বলা যায়। প্রতিকূলতার মাঝেও বর্তমান বিশ্বে প্রাচ্য, পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীদের উপস্থিতি। বিজয় হচ্ছে নারীর। পুরুষের সঙ্গে নারীও এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম। এখন নারীর অবস্থান রসুইঘর থেকে বিমানের ককপিটে। নারীর অবদানের কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে এবং থাকবে। তারপরও কেন নারীকে বিভাজনের মাধ্যমে চলতে হচ্ছে? কেন মানুষ সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করতে পারছে না? নারী যদি এতসব ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে সেই নারী জন্ম কেন এত নিরানন্দের? 

পুরুষ যেমন বাতি জ্বালিয়ে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করতে পারে, তেমনি একজন নারী যদি তার জন্মের পর থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত পরিবার তথা সমাজের সহযোগিতা পায়—তাহলে নারী শুধু পরিবার নয়, পুরো দেশ তথা সমগ্র বিশ্বে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোয় আলোকিত করতে সক্ষম হবে। আসুন আমরা চিন্তাচেতনাকে একটু সংস্কার করে নারী পুরুষকে সমান করে দেখি এবং সমান মর্যাদা দিই।

চট্টগ্রাম