খোদ রাজধানীর বুকে এখনো দুই শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে একটি সাপ্তাহিক গ্রাম্য হাট। শহরের দক্ষিণ সীমান্তে দখল আর দূষণে বর্তমানে মৃতপ্রায় নড়াই নদ। তার পানি হয়েছে কালো-পুঁতিগন্ধময়। তবুও সেই নদের বুক চিরেই মেরাদিয়া হাটের ঘাটে নৌকা এসে ভেড়ে আজও। হাটুরেরা আসেন দূরদূরান্ত থেকে। তরতাজা শাকসবজি, তরিতরকারী, মাছ-মুরগি, ডিম-দুধ, খাবার-দাবার, মাটির তৈজসপত্র, জামা-কাপড়, খেলনা, পশুপাখি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর দরদামের মুখরতা গ্রামের হাটবাজারের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই হাটেও কখনো কখনো দেখা মেলে জাদুকরের ভেল্কিবাজি, বাঁদর খেলা, ভেষজ ওষুধ বিক্রেতাদের লাউড-স্পিকারের তীব্র নিনাদ, ব্যাগ হাতে নারী-পুরুষের সদাইপাতি বেচাকেনা। কোথাও বাজছে গান। পাশে নদীতে সারি সারি নৌকা ও ট্রলার। হাটের দিকে স্রোতের মতো মানুষের আগমন প্রতি বুধবার এই মেগাসিটির বুকে রচনা করে এক নস্টালজিক দৃশ্যপট। বনশ্রীতে অবস্থিত এই মেরাদিয়া হাট যেন সপ্তাহের একটি দিনের মিলনমেলা হয়ে উঠছে। ঢাকায় নতুন বসতগাঁড়া অজপাড়াগাঁয়ের কারো মন খারাপ হলে এই হাট থেকে ঘুরে এলে মন ভালো হয়ে যেতে পারে। ‘হাটবার’ মানেই মানসপটে ভেসে ওঠে গ্রামীণ জনপদের প্রতিচ্ছবি। কোনো এক বটগাছকে ঘিরে কিংবা নদী তীরে সৃষ্টি হওয়া বড়ো কোনো বাজার। নগর জীবনে ‘হাটবার’ বলে কিছু নেই। তবে এই বিলীন হয়ে যাওয়া গল্পটি এখনো বেঁচে আছে মেরাদিয়া হাটকে ঘিরে । প্রতি বুধবার সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত সরব থাকে এই হাট।
এলাকাবাসীর কাছে এই হাটের পরিচিতি ‘মেরাইদ্দাহাট’ নামে। হাটবারের দিন হাটুরে ও বিক্রেতারা ফকিরখালী, ডেমরা, বাড্ডা, বেরাইদ, ইছাপুরা, রামপুরা, বনশ্রী, আফতাবনগর, খিলগাঁও, মুন্সিগঞ্জ, নাসিরাবাদ, ভুলতা, গোড়ানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের চনপাড়া, রূপগঞ্জ থেকেও অনেকেই কেনাবেচা করতে আসেন এই হাটে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে, ‘মেরাইদ্দা হাটে সুঁই থেকে শুরু করে হাতিও মেলে।’ প্রায় সব ধরনের পণ্য পাওয়া যাওয়ায় শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও এই হাটের আবেদন এখনো ফুরোয়নি, যদিও দখল, অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে এর কলেবর অনেকটা সংকুচিত হয়ে গেছে।
এই হাটের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষেত থেকে সদ্য তুলে আনা সতেজ শাকসবজি ও ফলমূল, দেশীয় নানা জাতের জ্যান্ত মাছ, নিজের গাভির টাটকা দুধ, দেশি হাঁস-মুরগি, ভিন্ন স্বাদের মুখরোচক গ্রাম্য খাবার, বাঁশ-বেতের পণ্যসহ মানুষের দরকারি সবকিছু ।
নৌকায় ভরে হাটে আসে কিছুক্ষণ আগে গাছ থেকে পেড়ে আনা জাম্বুরা, পেঁপে, পেয়ারা, আমলকী, আমড়া, কতবেল, ডাব, লেবু, পানিফল, জলপাই, সুপারি, বরজের পান। এছাড়া মিলবে গ্রামের মুড়ি, মুড়কি, গুড়, কিংবা টাটকা খেজুরের রস। হাট ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণাংশে কাঁচাবাজার। সেখানে তাজা বাঁধাকপি, সিম, টমেটো, বিটকপি, লালশাক, পুঁইশাক, কচুশাক, বেগুন, মুলা, হেলেঞ্চা, ডাঁটা, ঢেড়স, আলু, পটল, করলা, লাউ, কুমড়া, শালগমসহ অগণিত রকমের তরীতরকারি। সবজি বিক্রেতা আবদুর রহমান জানান, নরসিংদী, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে সবজি আসে এই হাটে। হাটের উত্তরে রাস্তার পাশে গ্রামের খাল-বিল থেকে ধরা শিং, চিংড়ি, কই, মাগুর, শিং, পুঁটি, শোল, টেংরাসহ বিভিন্ন ধরনের তাজা মাছ মিলবে। হাঁস-মুরগির দোকানগুলো এগুলোর ঠিক পাশেই। খাঁচা ছাড়াই দু-একটা করে বেঁধে রাখা হয়েছে, ঠিক গ্রামের হাটের মতো।
মেরাদিয়া হাটের মোড়ে মোড়ে নানা ধরনের মিষ্টির দোকান রয়েছে। টাঙ্গাইল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকার মিষ্টির পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয়ভাবে তৈরি রসগোল্লা, চমচম, গজা ইত্যাদি। হাটের বিভিন্ন স্থানেই দেখা যায়, ছোটো-বড়ো বোতলে দুধ নিয়ে এসেছেন বিক্রেতারা। একজন বিক্রেতা জানান, এখানে সবাই নিজেদের গরুর দুধই নিয়ে আসেন।
মেরাদিয়া হাটের পত্তন সম্পর্কে জানাযায়, নড়াই নদের (বর্তমানে রামপুরা খাল) তীরে ছিল একটি বিশাল বটবৃক্ষ। সেই বৃক্ষ তলে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠে এই হাট। পরে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বটগাছসংলগ্ন একটি পুকুরের চারপাশ ঘিরে ও পার্শ্ববর্তী মাঠে হাটের পরিসর বাড়ে। ৬৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বরকন্দাজ বলেন, এই হাটের বয়স ২০০ বছর পার হয়েছে। প্রথম থেকেই এই হাট বুধবারে বসত। অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত এই হাটে। তখন ঢাকা শহর ছিল অনেক দূরে। আমরা ছোটোবেলায় দেখেছি এইখানে বিশাল এক বটগাছ ছিল। রাতে দেখলে ভয় লাগত। এখন সেই গাছ আর নাই। আছে বড়ো বড়ো বিল্ডিং। হাটের মজাটাও আগের মতো নেই। নড়াই একসময় অনেক বড়ো নদ ছিল। পানি ছিল টলমলে পরিষ্কার।
বনশ্রীর জি ব্লকের আল-রাজি হাসপাতাল থেকে শুরু করে পূর্ব দিকে ফয়জুর রহমান স্কুল পর্যন্ত বর্তমানে হাট বসে। নতুন নতুন ভবন উঠতে থাকায় স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখন রাস্তার দুই পাশকেই মূলত হাট হিসেবে ধরা হয়। ভবিষ্যতে এই হাট হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেন অনেকে। হাটের ব্যবসায়ীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, পাশে রামপুরা খাল (নড়াই নদ)। এটার কালো পানির দুর্গন্ধ তো আছেই; রাস্তার ওপর ময়লার ভাগাড় জমে আছে। সিটি করপোরেশন এটা নিয়ন্ত্রণ করে সুন্দর একটা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে।
