মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, সহকারি শিক্ষক
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা
শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব
১। নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
‘আমার বিশ্বাস শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই। এমনকি, এক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই; এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিত থাকি এই বিশ্বাসে যে, সেখানে থেকে তারা এতটা বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসবে যার সুদে তার বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে।’
ক.মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায় কী? ১
খ.‘অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি’- কথাটির অর্থ বুঝিয়ে লেখ। ২
গ.উদ্দীপকে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের কোন দিকটির ইঙ্গিত রয়েছে? বর্ণনা কর। ৩
ঘ.উদ্দীপকে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিকের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়েছে কি? উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দেখাও। ৪
ক.মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায় হলো শিক্ষা।
খ.‘অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি’ কথাটির অর্থ হলো-সবাই অর্থ উপার্জনের চিন্তার শিকলে বন্দী।
মানুষ হিসেবে আমাদের প্রয়োজন ক্ষুিপপাসার তৃপ্তি ও মানবসত্তার ঘরে আরোহণের চেষ্টা। কিন্তু ভুল শিক্ষা ও বিশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থার কারণে আমরা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই এবং জীবসত্তার ঘরেই আবদ্ধ থাকি। অর্থাত্ অর্থ উপার্জনের চিন্তায় নিমগ্ন থাকি। আর এভাবে মনুষ্যত্বলোকের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয় না। তখন অর্থসাধনাই হয়ে ওঠে জীবনসাধনা। অর্থাত্ মানবজীবন অর্থের চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে যায়।
গ.উদ্দীপকে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের জীবসত্তার ইঙ্গিত রয়েছে। ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে জীবসত্তার ঘরটি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ থাকে। সকলেই এখানে অর্থচিন্তার নিগড়ে সর্বদা বন্দী। মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধনের কোনো উপায় এখানে নেই। কেননা অর্থসাধনাই যে জীবনসাধনা নয় এ বোধটি জীবসত্তার ঘরে বিচরণকারীদের মধ্যে অনুপস্থিত। তাই এরা মনুষ্যত্বলোকের সন্ধান পায় না; অন্ধকারে থেকে যায়।উদ্দীপকে লক্ষ করা যায়, জীবসত্তার নিগড়ে বন্দী অর্থচিন্তায় মগ্ন মানুষের চিত্র। প্রকৃত শিক্ষা তথা শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য এখানে অনুপস্থিত। বিদ্যাদাতারা অর্থের বিনিময়ে জ্ঞান দান করছেন। অপরদিকে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শিক্ষার উদ্দেশ্য মূল্যবোধ সৃষ্টি, জ্ঞান পরিবেশন নয়। কিন্তু তারা জ্ঞান পরিবেশন করছেন অর্থের মোহে পড়ে। এছাড়া অভিভাবকেরাও মনে করছেন, তাদের কাছে গেলেই প্রকৃত বিদ্যার্জন করবে। যার ফলে সারাজীবন পায়ের ওপর পা তুলে কাটিয়ে দিতে পারবে। শিক্ষার উদ্দেশ্য যে মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন তা তাদের বোধোদয়ের সম্পূর্ণ বাইরে। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে শিক্ষার জীবসত্তার দিকটিই প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘ.না, উদ্দীপকে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিকের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন করা। অন্নচিন্তা কিংবা অর্থচিন্তা নয়। অর্থ-সাধনাই জীবনের মূল সাধনা হতে পারে না। শিক্ষা দিয়ে চিন্তা, বুদ্ধি ও আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমে মুক্তি অর্জনই হলো জীবনের মূল সাধনা। আর এ সাধনার মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন সুন্দর, উপভোগ্য হয়ে উঠবে। এর ব্যক্তিক্রম হলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। উদ্দীপকে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যের ব্যত্যয় ঘটেছে। কেননা ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক বলেছেন, শিক্ষার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। কিন্তু উদ্দীপকে শিক্ষাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমরূপে গণ্য করা হয়েছে। মূলত প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে স্বশিক্ষিত করে তোলে। স্বশিক্ষিত ব্যক্তি মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটার সাথে সাথে সমাজের কল্যাণকর চিন্তায় মনোনিবেশ করেন। অন্নচিন্তা ও অর্থচিন্তা এর আওতাভুক্ত নয়। অথচ আজকের দিনের বিদ্যাদাতারা অর্থের লোভে জ্ঞান দান করেন। অন্যদিকে অভিভাবকেরাও ভাবেন, এর ফলে তাদের সন্তানেরা বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে। অথচ প্রাবন্ধিক শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধনের কথা তুলে ধরেছেন যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। সুতরাং পরিশেষে বলা যায় যে, ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের লেখকের যে উদ্দেশ্য তা উদ্দীপকে বাস্তবায়িত হয়নি।
