বাংলাদেশে নৌপথের নানা প্রতিবন্ধকতা রহিয়াছে। এই শীতকালে আমাদের নৌপথগুলিতে বড়ো সমস্যা নাব্যসংকট। এইজন্য যে ড্রেজিং করিবার উদ্যোগ নাই তাহা নহে। নৌপথগুলির একটি নিয়মিত সমস্যা হইল অধিকাংশ স্থানে মার্কার নাই, নাই বয়াবাতি। ইহার কারণে অনেক সময় ঘটে নৌদুর্ঘটনা। ইহার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হইল ডুবিয়া থাকা নৌযান। বিশেষ করিয়া ঢাকা-বরিশাল নৌপথে এইরূপ নৌযান এখন গলার কাঁটা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিভিন্ন সময় নানা দুর্ঘটনায় নদীতে ডুবিয়া যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ, ট্রলার ও পণ্যবাহী কার্গো; কিন্তু এইসব নৌযানের অধিকাংশ আর উত্তোলন করা হয় না। আমরা সড়ক পথে দেখিতে পাই, কোনো যানবাহন দুর্ঘটনাকবলিত হইলে সেই সড়কে যানজট সৃষ্টিসহ স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। এইজন্য যথাসম্ভব দ্রুত রেকার দিয়া তাহা অপসারণের ব্যবস্থা করা হয়; কিন্তু নৌপথে এ বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব পায় না। পানির গভীরতা বেশি হইলে অনেক ডুবন্ত নৌযান শেষপর্যন্ত আর উদ্ধারই করা যায় না।
জানা যায়, কেবল ঢাকা-বরিশাল নৌপথে গত পাঁচ বত্সরে ডুবিয়া গিয়াছে সাতটি পণ্যবাহী নৌযান। এইসব নিমজ্জিত নৌযান উদ্ধারে বিআইডব্লিউটিএ-এর রহিয়াছে মাত্র চারটি উদ্ধারকারী জাহাজ। এই চারটি জাহাজের সক্ষমতা লইয়া আবার প্রশ্ন রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া এইসব জাহাজের ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ২৫০ টন। আর ডুবিয়া যাওয়া নৌযানগুলির ওজন ১ হাজার হইতে ১ হাজার ২০০ টন। ফলে বড়ো বড়ো নিমজ্জিত নৌযান নদীতেই থাকিয়া যাইতেছে। পরে বিআইডব্লিউটিএ নৌযান মালিকদের তাহা তুলিয়া নেওয়ার চিঠি দিয়াই দায়িত্ব-কর্তব্য শেষ করে। সক্ষমতার ঘাটতি ও ব্যয় বিবেচনায় মালিকরাও তাহা তুলিয়া নেন না। ফলে নদীতে যখন পানি কমিয়া আসে, তখন দেখা দেয় বিপত্তি। এই সময় লঞ্চ মালিক সমিতি বিআইডব্লিউটিএকে নদী পরিষ্কার করিবার অনুরোধ করে। মূলত নাব্যসংকট, অদক্ষ চালক, লঞ্চে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা নৌযান, ফিটনেসবিহীন নৌযান, ঝড়তুফান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মনিটরিংয়ের অভাবে নৌপথে ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। বিশেষত যেই সকল স্থানে কাছাকাছি এলাকায় একাধিক নৌযান নিমজ্জিত হয়, তাহা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া পড়ে। সেইখানে নদীপথ সরু হইয়া যায়। অনেক স্থানে এইজন্য বড়ো লঞ্চগুলিকে অন্য রুট দিয়া চলাচল করিতে হয় যাহা অধিক সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। যেসব লঞ্চে পানি মাপিবার যন্ত্র (ইকোসাউন্ডার) নাই, তাহারা আরো বিপদে পড়েন।
উল্লেখ্য, বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ও রুস্তম অত্যন্ত পুরাতন, যাহা সংগ্রহ করা হয় যথাক্রমে ১৯৬৫ ও ১৯৮৪ সালে। এই দুইটি জাহাজের ক্রেনের উত্তোলন ক্ষমতা মাত্র ৬০ টন। ২০১৩ সালে কোরিয়া হইতে আমদানি করা হয় নির্ভিক ও প্রত্যয় নামে দু্ইটি উদ্ধারকারী জাহাজ, যাহাদের উত্তোলন ক্ষমতা ২৫০ টন। এই দুইটি জাহাজ আবার পানির গভীরতা ছাড়া চলাচল করিতে পারে না। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটিলে টাগ বা অন্য জাহাজের সাহায্যে টানিয়া লইয়া যাইতে হয়। ভাটার সময় ইহার গতি কমিয়া যায়। ইহাতে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাইতে দীর্ঘ সময় লাগে। এমতাবস্থায় অধিক সক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ দরকার। ডুবন্ত নৌযানের মালিকরা নির্দিষ্ট সময়ে তাহা উদ্ধার না করিলে সরকার তাহা তুলিয়া নিলামে বিক্রয় করিয়া দিতে পারে। নৌপথগুলি সচল রাখিবার জন্য নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অবশ্যই উন্নত করিতে হইবে।
