অঞ্জন রায় চৌধুরী
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভারত সফর করেন। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নে এই সফর ছিল একটি মাইলফলক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে গেল বছরে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। কিছু ইস্যু ঝুলে থাকলেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। দুই দেশের উচিত এই সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেওয়া।
ভারত সফরকালে সাতটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চূড়ান্ত করা হয় তিনটি প্রকল্প। এতে দুই দেশের সম্পর্কের নয়া রূপান্তর ঘটে। ভারত ও বাংলাদেশ এখন সুপ্রতিবেশীর এক রোল মডেল। ত্রিপুরায় গ্যাস সরবরাহের চুক্তি এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যসমূহে বিভিন্ন সেবা প্রদানে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে সুযোগ প্রদানের ফলে দুই দেশের মধ্যে চমত্কার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে তরুণদের প্রশিক্ষণে দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরির অন্যতম উদাহরণ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর দুই দেশ এক যৌথ বিবৃতি দেয়। এর প্রধান দিক ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনার মধ্যে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো—সীমান্তে বেসামরিক লোকদের প্রাণহানি যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় সাধন; আখাউড়া (ত্রিপুরা) ও ঘোজাদাঙ্গা (পশ্চিমবঙ্গ) চেকপয়েন্টে দুই দেশের নাগরিকদের বৈধ চলাচল সহজতর করা; উগ্রপন্থি, সন্ত্রাসী, জঙ্গি, চোরাচালানি, অর্থ পাচারকারী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সহযোগিতামূলক জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ; দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বমূলক চুক্তি সম্পাদন; সমন্বিত চেকপোস্টের ব্যাপারে আলোচনা; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বৃদ্ধি করা; আখাউড়া-আগরতলা বন্দরে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা; সীমান্ত হাট বৃদ্ধি করে তা ১২টিতে উন্নীত করা ইত্যাদি। অন্যান্য প্রচেষ্টার মধ্যে ছিল—বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) উপ-আঞ্চলিক জোটের আলোকে মোটর ভেহিক্যালস চুক্তি এবং রেলওয়ে, বাস ও বিমানের ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়িয়ে কানেকটিভিটি বৃদ্ধি করা; তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়ন; ত্রিপুরার জনগণের জন্য ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার; প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সংহত উন্নয়ন সহযোগিতা, জ্বালানি সহযোগিতা, শিক্ষামূলক ও যুবকদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এবং মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আগত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যৌথ প্রচেষ্টা গ্রহণ ইত্যাদি।
গত বছরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে রয়েছে—টেস্ট ম্যাচ খেলা দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কলকাতা সফর এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতের নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর। ২০১৯ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এই সময়ে মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। এছাড়া দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কতিপয় সফরও অনুষ্ঠিত হয়েছে গেল বছরে। ২০১৯ সালে ভারত বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে সম্মত হয়েছে। চেন্নাইতে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের অফিস স্থাপনের বিষয়টি বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলএনজির জন্য পাইপলাইন স্থাপনে ভারতের বিনিয়োগ লাভের জন্য তার আকাঙ্ক্ষার কথাও বলেছেন আকারে-ইংগিতে।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সব রকমের আয়োজনই করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অব্যাহতভাবে অংশীদারিত্ব থেকে উভয় দেশই লাভবান হচ্ছে। নয়াদিল্লিকে অংশীদারিত্বমূলক এমন সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, যাতে দুই দেশেরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় এবং উন্নয়নমূলক সূচকে উন্নতি ঘটে। ভারত সরকার ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে এনএরসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস) বাংলাদেশের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। এছাড়া তিস্তার মতো অন্যান্য বিশেষ ইস্যুর প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকার সাহায্য প্রদানের ডাকে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে এই দেশটি ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের মধ্যে এই দেশ স্বল্পোন্নত উন্নয়নশীল দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। শেখ হাসিনা জটিল অনেক ইস্যু মোকাবিলায় তার পূর্বসূরিদের চেয়ে অধিক সফল হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতে ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যার বিচারে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালি শহিদ হন। যারা পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছে এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে নির্মমভাবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছেন। গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে যেসব সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেও তিনি নিয়েছেন শক্তিশালী পদক্ষেপ। তার আমলে জেএমবি নির্মূলের প্রচেষ্টাও শক্তিশালী হয়েছে, যাদের লক্ষ্যই হচ্ছে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১০ সালে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকেই সমুন্নত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেছেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ছিটমহলের সংকট দূরীকরণে একসঙ্গে কাজ করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমার থেকে আগত প্রায় ১১ মিলিয়ন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং কক্সবাজারে তাদের জন্য নির্মাণ করেছে বাড়িঘর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সামাজিক ক্ষমতায়ন, গার্হস্থ্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজীকরণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭-৮-এ উন্নীত করতে সহায়তা করেছে। শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প অগ্রগতির দিক থেকে ভারত ও চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে বিপুলসংখ্যক নারীর চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং লাভ করেছে তুমুল জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজীকরণ র্যাংকিংয়েও ভালো করছে। ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্যের প্রতি জোর দিয়েছেন।
লেখক :ইত্তেফাকের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
ইংরেজি থেকে অনুবাদ :ফাইজুল ইসলাম
