দূষিত শহরের অভিধা আর চাই না

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪৭

আজি হইতে শত বত্সর পূর্বে রবীন্দ্রনাথ বলিয়া গিয়াছেন :‘সবুজ নেশায় ভোর করেছি ধরা,/ ঝড়ের মেঘে তোরি তড়িত্ ভরা।’ সবুজকে তিনি আহ্বান জানাইয়াছেন আধমরাদের ঘা মারিয়া বাঁচাইবার জন্য। ঢাকা শহর এখন সেই আধমরাদের দলে। বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও বসবাস-অযোগ্য এই শহরটিতে সবুজের ছোঁয়া সামান্য একটুখানি বাড়িয়াছে বটে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। আমরা জানি যে, একটি নগরের বাসযোগ্যতা নির্ভর করিয়া থাকে উহার পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার উপর। নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হইতেছে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর মানবঘটিত কর্মকাণ্ডের ক্ষতিকর প্রভাব দূর করা। ইহার পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপাদানগুলির দূষণ রোধ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও জরুরি। অথচ গত দুই দশকে রাজধানীর খোলা জায়গার পরিমাণ তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়া আসিয়াছে। ভূমি ব্যবহার লইয়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) একটি গবেষণায় এই সকল বিষয় বিস্তারিত উঠিয়া আসিয়াছে। সেইখানে বলা হইয়াছে, রাজধানীর মোট ভূমির মাত্র ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ এখন খোলা জায়গা হিসাবে টিকিয়া রহিয়াছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ঢাকা শহরের ৬৫ ভাগ কংক্রিট বা অবকাঠামোতে আচ্ছাদিত ছিল। ২০১৯ সালে তাহা বাড়িয়া হইয়াছে প্রায় ৮২ ভাগ। এই সময়ে জলাশয় ও খোলা জায়গা প্রায় ১৪ ভাগ হইতে কমিয়া ৫ ভাগের নিচে নামিয়া আসিয়াছে। কেবল সবুজে আচ্ছাদিত এলাকা কিছুটা বাড়িয়াছে। উহা ৬ দশমিক ৬৯ ভাগ হইতে বাড়িয়া ৯ দশমিক ২০ হইয়াছে। তবে একটি আদর্শ নগরে ১৫ হইতে ২০ শতাংশ সবুজ এলাকা, ১০ হইতে ১৫ শতাংশ জলাশয় এবং প্রতিটি মানুষের জন্য ৯-৫০ বর্গমিটার সবুজ এলাকা প্রয়োজন।

স্পষ্টতই সকল সূচকেই ঢাকা পিছাইয়া রহিয়াছে। ফলে রাজধানী ঢাকা এখন বাসযোগ্যতার প্রেক্ষিতে বৈশ্বিক মানদণ্ডে তলানিতে অবস্থান করিতেছে। আশঙ্কা করা হইতেছে, যেইটুকু সামান্য খোলা ভূমি অবশিষ্ট রহিয়াছে, তাহার একটি অংশ আগামী দুই দশকে হারাইয়া যাইতে পারে। কারণ ঢাকাকে এখন বিবেচনা করা হয় ‘দোকান’ হিসাবে। ইহার সবটুকুই যেন শুষিয়া লইতেই হইবে মুনাফার নিমিত্ত! শহর ও সংলগ্ন এলাকার কৃষিজমি, জলাশয়সহ নিচু এলাকাগুলি ঢাকার জন্য ফুসফুসের মতো। কিন্তু সেই ফুসফুসেও সবুজের আচ্ছাদন ব্যাপকহারে হ্রাস পাইতেছে। সেইখানেও শিল্পকারখানা ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা এবং মাত্রাতিরিক্ত নির্মাণকাজের বিষ ছড়াইয়া পড়িতেছে। আর এইভাবেই ঢাকা অর্জন করিতেছে বিশ্বের সবচাইতে দূষিত শহরের অভিধা।

এই অবস্থা হইতে উত্তরণের উপায় যে অজানা, তাহা নহে। কিন্তু তাহা কার্যকর করিবার মতো সদিচ্ছা কর্তৃপক্ষের রহিয়াছে কি না, তাহা লইয়া অনেকের মনে প্রশ্ন রহিয়াছে। শহরের চারিপাশে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করিবার পাশাপাশি বিদ্যমান জলাশয় সংরক্ষণ ও দখলকৃত জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং এলাকাভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক সবুজ এলাকা গড়িয়া তোলা কি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অসম্ভব কাজ? রবীন্দ্রনাথ সেই কোন কালে বলিয়াছেন, দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর। তিনি ঢাকার পরিবেশ দেখিলে বোধহয় ভাষাহীন হইয়া যাইতেন।