পুলিশকে আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়তে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ২২:০৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশকে আধুনিক এবং জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে তার সরকার বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২০’ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থকে আমরা ব্যয় হিসাবে নেই না। আমরা মনে করি জনগণের স্বার্থে জনগণের কল্যাণে এটা আমাদের এক ধরনের বিনিয়োগ। কাজেই সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা এই পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক সাজে সজ্জিত এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে জনগণের সেবা যাতে নিশ্চিত করতে পারি তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ আমরা নিয়ে যাচ্ছি। যার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশের মধ্যেও গুণগত বিরাট পরিবর্তন এসেছে। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের পুলিশ বাহিনী জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী হবে।’ শেখ হাসিনা পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষ্যে সারাদেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত নয়নাভিরাম প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন।’ তিনি অনুষ্ঠানে ১১৮ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও পুলিশ পদক সেবা এবং রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক এবং রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক সেবায় ভূষিতদের মধ্যে পদক বিতরণ করেন। পুলিশ বাহিনীর সদস্যগণের অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪ জনকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ২০ জনকে  ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ২৮ জনকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’ এবং ৫৬ জনকে ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’ প্রদান করা হয়। বিপিএম মরহুম মো. আকতার হোসেন (মরণোত্তর)-এর পক্ষে তার সহধর্মিণী এবং দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত এএসআই নান্নু মিয়া হুইল চেয়ারে বসে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, পুলিশ বাহিনীকে জনগণের পুলিশ হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের মধ্য দিয়ে যেকোনো ধরনের অপরাধ দমন করা সহজ এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনারা কাজ করবেন সেটাই আমি আশা করি। বর্তমানে দেশে অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকায় বিনিয়োগ আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী একে অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সময় প্রতিটি পুলিশ সদস্য নিজের জীবনকে বাজি রেখে দেশের মানুষ এবং জাতীয় সম্পদকে রক্ষা করেছেন। তিনি এজন্য পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানান। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, বাংলাদেশ থেকে আমরা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতি দূর করব এবং এসবের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একদিকে যেমন জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে তেমনি সড়কে শৃঙ্খলাও ফিরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনী যথেষ্ট সুশৃঙ্খল ভূমিকা রাখছে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জাতীয় জরুরি সেবা-‘৯৯৯’ এরই মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জনগণ ‘৯৯৯’ ব্যবহার করে এখন খুব সহজেই ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের সেবা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সোশ্যাল মিডিয়াসহ অন্যান্য প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দেশে গুজব রটনাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতেও পুলিশ বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন।

আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন পুলিশ বাহিনী চলতে পারে সে ব্যবস্থাও তার সরকার নিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে নারী পুলিশের জন্য একটি স্বতন্ত্র ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এছাড়া পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা, এর আওতায় কমিউনিটি ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু এবং পুলিশ সদস্যদের জন্য একই ধরনের রেশনিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ সকল পুলিশ সদস্যকে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।’ প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন—জনগণের পুলিশ।’ বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি জনগণের সমস্যাকে আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখারও আহ্বান জানান। ২০২০ সালকে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৭ মার্চ জাতির পিতা জন্মগ্রহণ করেছেন। আর ২০২১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আমরা ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ ঘোষণা করেছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারী ও অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মো. মইনুর রহমান চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সিনিয়র পুলিশ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’—এ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনা এবং আনন্দমুখর পরিবেশে পাঁচ দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ-২০২০ উদ্যাপিত হচ্ছে। চলবে আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত।

পুলিশের দাবি পূরণ না হওয়ায়

প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্দেশ সত্ত্বেও পুলিশের দাবি পূরণ না হওয়ায় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এসব দাবির বিষয়ে তিনি সম্মতি দেওয়ার পরও কেন পূরণ হয়নি, তা তাকে অতিসত্বর জানাতেও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর কল্যাণ সভায় প্রধানমন্ত্রী এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে। গত দুই পুলিশ সপ্তাহে যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে, তার প্রায় সবই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও আশ্বাস সত্ত্বেও। পুরোনো এ দাবিগুলো ফের প্রধানমন্ত্রীর সামনে উত্থাপন করা হলে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সভায় পুলিশ তাদের পুরোনো দাবিগুলো তুলে ধরে এবারও। পুলিশের পক্ষ থেকে কনস্টেবল থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে কথা বলেন।

পুলিশ সদস্যরা নানাবিধ ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় কাজে থাকেন বলে চাকরি-পরবর্তী সময়ে অন্যরা যখন ভিন্ন কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন, পুলিশ সদস্যরা নানা প্রকার অসুস্থতায় ভোগেন। এ সময় তাদের জীবন ও জীবিকা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। তাই পুলিশ সদস্যরা তাদের জন্য দুই জন হিসেবে ধরে আজীবন রেশন সুবিধার দাবি তোলেন। এ দাবিটিকে অত্যন্ত যৌক্তিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তা বাস্তবায়নে সম্মতি দেন। অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছুটিতে গিয়ে মারা গেলেও এককালীন ৮ লাখ টাকা পান, পুলিশের একজন সদস্য জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হলেও পান ৫ লাখ টাকা। অন্যান্য সরকারি দপ্তরের একজন সদস্য সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো উপায়ে আহত হলে যেখানে ৪ লাখ টাকা পান, সেখানে পুলিশের একজন সদস্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে গুরুতর আহত হলেও পান ১ লাখ টাকা। এ বিষয়ে সমতায়নের জন্য পুলিশের তোলা বিগত কয়েকটি দাবি পুনরুত্থাপন করা হয়।