কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) তরল বর্জ্য চুইয়ে আশপাশের কমপক্ষে ১০ গ্রামের নিচু জমি, খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ের পানিতে মিশছে। বর্জ্যের কালো পানি থেকে বাতাসে উত্কট গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে জমিতে ফসলের উত্পাদন কম হওয়ার পাশাপাশি জলজ উদ্ভিদ এবং খাল-বিলের নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ মরে যাচ্ছে। খেতে-খামারে কাজ করতে গিয়ে চর্ম ও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষজন। এতে পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দক্ষিণাংশ এবং সদর দক্ষিণ এলাকার কৃষক ও নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের দাবি—তারা নিজেদের বর্জ্য নিজেরা নিয়ন্ত্রণে রাখেন, এখানকার বর্জ্য কোথাও যায় না।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সদর দক্ষিণ উপজেলার দিশাবন্দ ও আশপাশের এলাকার খাল ও কৃষি জমির পানি কালো। টঙ্গীরপাড় এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর স্লুইসগেটের নিচে পানির রং কালো। এর লাগোয়া খাল ও বিলের পানিও কালো। বিজয়পুর জেলখানা বাড়ি এলাকার রেলসেতুর নিচেও কালো পানি। কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়কের বিজয়পুর পাকা সেতুর নিচেও কালো পানি। বামিশা ও দিঘিরপাড় কলেজের আশপাশের কৃষিজমিতেও কালো পানি দেখা গেছে। কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিক্যাল কলেজের পেছনের কৃষিজমি, জলাশয় ও বিলের পানি কালো। লালমাই উপজেলার দত্তপুর এলাকার খালেও কালো পানি। লাকসামের ডাকাতিয়া নদীর অংশেও একই অবস্থা। পানি থেকে বাতাসে পচা গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নেউরা, রাজাপাড়া, দিশাবন্দ, শ্রীভল্লবপুর, কাজীপাড়া রামপুর এলাকার কৃষক জয়নাল আবেদীন, আবুল বাশার, ময়নাল হোসেন, স্কুলশিক্ষক আনিছুর রহমান, ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনসহ বিভিন্ন পেশার অন্তত ১৮ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদক কথা বলেন। তারা বলেছেন, ‘কুমিল্লা ইপিজেডে সাড়ে চার বছর আগে কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়। তখন ভেবেছিলাম এলাকার জমিতে তরল বর্জ্য আর ঢুকবে না। কিন্তু ইপিজেডের তরল বর্জ্য চুইয়ে পানিতে মিশছে। এ কারণে জলাশয়ের মাছ মরে যাচ্ছে। জমিতে ফসলের উত্পাদনও আগের তুলনায় কম হচ্ছে। এছাড়া দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানির কারণে দিনমজুরেরা বেশি মজুরিতেও খেতে-খামারে কাজ করতে চান না। চর্মরোগ দেখা দেয়। এতে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে ২৬৭.৪৬ একর জায়গা নিয়ে কুমিল্লা ইপিজেড প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০০০ সালের ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইপিজেডের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এই ইপিজেডে ১৯টি বিদেশি, ১০টি দেশি ও যৌথ মালিকানাধীন ৩৭টি কারখানা চালু রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার সময় কুমিল্লা ইপিজেডে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপন না করায় ইপিজেডের তরল বর্জ্যে আশপাশের এলাকার কৃষকের জমির ফসল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেন। পরে ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বরে ইপিজেডের দক্ষিণ প্রান্তে বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর শেষ হয়। এতে ব্যয় হয় ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বর্জ্য পরিশোধনাগারটি রাসায়নিক ও জৈবিক উভয় পদ্ধতিতে প্রতি দিন কমপক্ষে ১৫ হাজার ঘন মিটার বর্জ্য পরিশোধন করতে পারে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, এর পরও তরল বর্জ্য চুইয়ে আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের ফসলি জমি, নদী-নালা, পুকুর, বিল ও জলাশয়ের পানির সঙ্গে মিশছে। এতে জমিতে ফসল কম হচ্ছে এবং নানা প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মো. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ইপিজেডের কারখানার বর্জ্যের কারণে আশপাশের শত শত ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে নানা প্রজাতির মাছ। এতে চর্মরোগ ছাড়াও জটিল রোগ দেখা দিতে পারে।’ সদর দক্ষিণ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘ইপিজেডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ১০ বছর ধরে কথা বলে আসছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না।’ কুমিল্লা সিটি মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ‘এ বিষয়ে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তবে ইপিজেডের তরল বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের কথা অস্বীকার কুমিল্লা ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক (জি এম) মো. জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ইপিজেডের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। এতে কারখানাগুলো কেন্দ্রীয়ভাবেই বর্জ্য পরিশোধনের সুযোগ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা প্রতিনিয়ত এসে এটি পরিদর্শন করছেন। আমরা নিজেদের বর্জ্য নিজেরা নিয়ন্ত্রণে রাখি। এখান থেকে বর্জ্য কোথাও যায় না বলে তিনি দাবি করেন।
