বিশ্বব্যাপী রেলপথকে মনে করা হয় সবচাইতে নিরাপদ যাতায়াতের মাধ্যম। রেল দুর্ঘটনা বহির্বিশ্বেও যে কদাচিত ঘটে না, তাহা নহে। তবে আধুনিক যন্ত্রচালিত বাহন বিমান, জাহাজ, মোটরগাড়ি এবং রেলওয়ে শুরু হইবার পর হইতে রেলপথেই সবচাইতে কম দুর্ঘটনা দেখা গিয়াছে; কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে দেখা যাইতেছে উলটা চিত্র। পত্রিকান্তরে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে বিগত বত্সরের রেল দুর্ঘটনা লইয়া। ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ৩৯৩টি রেল দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে যাহাতে নিহত হইয়াছে কমপক্ষে ৪২১ জন এবং আহত হইয়াছে অন্তত ৩৬৬ জন। ইহা ছাড়া লাইনচ্যুত হওয়া অথবা পথিমধ্যে ইঞ্জিন বিকল হইয়া যাওয়ার ঘটনাতো আছেই। রেলওয়ের মতো নিরাপদ বাহনের এই অস্বাভাবিক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার কারণগুলি যে আমাদের জানা নাই, তাহা নহে; কিন্তু সেই কারণগুলির সমাধান কেন হইতেছে না, তাহা জনমনে একটি বড়ো প্রশ্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রচলিত ধারণা এবং রেলওয়ের বিভিন্ন সময়ের ব্যাখ্যা হইতে আমরা জানি, দেশব্যাপী সড়ক বিস্তারের কারণে অননুমোদিত ও অপরিকল্পিত রেলক্রসিং নির্মিত হইয়াছে, অনেক রেলক্রসিংয়ে পাহারাদার নাই, রেললাইন ব্যবহারে জনগণের অসচেতনতা, সিগন্যাল অমান্য করা, ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালিং ও দুর্বল অবকাঠামো, আয়ুষ্কাল শেষ হইয়া যাওয়া ইঞ্জিনের ব্যবহার, চালকসহ কারিগরি কর্মীদের অদক্ষতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং প্রয়োজনীয় জনবল এবং যন্ত্রপাতির সংকট; কিন্তু ইহার বাহিরেও কিছু নীতিগত দুর্বলতা রহিয়াছে। রেলওয়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখা যাইতেছে, মূল লাইন না করিয়া এবং মূল লাইনের সংস্কার না করিয়া ডিস্ট্রিবিউট লাইন করিতেছে। উহা অনেকটা ফরজ রাখিয়া নফল কাজ করিবার মতো।
বিচিত্র আমাদের দেশ, আমাদের সকল কর্মকাণ্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়শই বলিয়া থাকেন, অধিক রাস্তা তৈরির প্রয়োজন নাই। উহাতে কৃষিজমি কমিয়া যায়; কিন্তু তাহার পরও দেশব্যাপী অপরিকল্পিত রাস্তা তৈরি হইতেছে। আমরা জানি, উন্নয়নের জন্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করিবার জন্য সড়কের বিস্তার প্রয়োজন রহিয়াছে; কিন্তু সেই ক্ষেত্রে সড়ক ও রেলওয়ের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় থাকিবে না কেন? রেলওয়েতে যত দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে দেখা যায় তাহার বেশির ভাগই রেলক্রসিং কেন্দ্রিক। সুতরাং রেলওয়ের উচিত হইবে, যথেষ্ট লোকবল নিয়োগ দিয়া, সিগন্যালিং ব্যবস্থাকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া রেলপথকে নিরাপদ করিয়া তোলা। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ একটি সমতলভূমির দেশ। এইখানে রেলওয়েই সকলের চাইতে উপযুক্ত বাহন হইতে পারিত; কিন্তু রেলওয়ের যথোপযুক্ত সংস্কারের অভাবে এবং নানা জটিলতায় ইহা জনপ্রিয়তা হারাইতেছে। ইহার সহিত রেল দুর্ঘটনাও যাত্রীদের জন্য দুঃশ্চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এইসকল প্রতিবন্ধকতা দূর করিবার মধ্য দিয়া রেলওয়েকে জনপ্রিয় ও নিরাপদ করিয়া তুলিতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে বলিয়া আমরা আশা করি।
