ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণ

উত্তাল ক্যাম্পাস

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২০, ২২:২৩

সংলগ্ন আর্মি গল্ফ গার্ডেনের সামনে বিমানবন্দর সড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। রবিবার রাতে ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি আছেন। চিকিত্সাধীন শিক্ষার্থীকে দেখতে গিয়ে ঢাবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

গতকাল সকালে ঐ ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ৩০-৩৫ বছরের এক যুবককে আসামি করেছেন। সিআইডির ক্রাইম সিন বিভাগ ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। ঐ ছাত্রীর চিকিত্সায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করেছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ঐ ছাত্রীকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ।

ঘটনাস্থলের বর্ণনা :বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের ফুটপাত ধরে ৩০০ গজ হাঁটা পথে এগোলে ধর্ষণের ঘটনাস্থলটি। সেনা গল্ফ গার্ডেন সন্নিকটে এ ঘটনা ঘটলেও এলাকায় সব সময় নিরাপত্তারক্ষীদের আনাগোনা থাকে। তবে রাতে পথচারী থাকে কম। এর আগে ঘটনাস্থলের অদূরে কুড়িল ফ্লাইওভারের কাছে এক গারো তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এছাড়া এই এলাকায় প্রায়ই ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ভবঘুরে মাদকসেবীদের দেখা যায়। ফুটপাত-সংলগ্ন ঝোপঝাড় তল্লাশি করে ধর্ষণের ঘটনাস্থলটি খুঁজে পায় পুলিশ। সেখানে তখনো ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীর ইনহেলার, ক্লাসের নোটবুক, লেকচারশিট, চাবির রিং, একখণ্ড পোশাক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। সেখানে একটি কালো রঙের জিনস প্যান্ট ও এক জোড়া জুতা পড়ে থাকতে দেখা যায়। পুলিশের ধারণা, জিনস প্যান্ট ও জুতা ধর্ষকের হতে পারে। পরে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম উপস্থিত এসব আলামত জব্দ করে। তবে ঘটনাস্থলে ঐ ছাত্রীর ব্যবহূত মোবাইল ফোন পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার্থীর জবানবন্দি :ধর্ষণের শিকার ঐ ছাত্রী পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাস থেকে কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে নেমে হেঁটে ফুটপাত ধরে সামনের দিকে বান্ধবীর বাসার দিকে আগাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে পেছন থেকে কেউ একজন এসে আমার মুখ চেপে ধরে। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। তবে যে আমার মুখ চেপে ধরে, তার চেহারাটা একপলকে দেখেই জ্ঞান হারাই। পার্শ্ববর্তী ঝোপের আড়ালে নিয়ে আমাকে অজ্ঞান করে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে রাত ১০টার দিকে চেতনা ফিরলে আমি নিজেকে নির্জন স্থানে আবিষ্কার করি। সেখানে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে শেওড়ায় বান্ধবীর বাসায় পৌঁছে তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলি। রাত ১২টার দিকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় হলে এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয় আমাকে।’ ওই ছাত্রীর সহপাঠীরা জানান, কুড়িলের শেওড়ায় বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে রবিবার বিকাল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষণিকা বাসে ওঠেন ঐ ছাত্রী। কিন্তু সন্ধ্যার পর ভুল করে শেওড়া বাসস্ট্যান্ডে না নেমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে গতিরোধকের কাছে তিনি বাস থেকে নামেন। এরপর হাসপাতালের ফুটপাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকেন। এরপর শেওড়া বাসস্ট্যান্ডের আগে ফুটপাতে অজ্ঞাত যুবক তার মুখ চেপে ধরে ঝোপঝাড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে।

ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ্ত কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘মেয়েটির বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনায় একজন জড়িত থাকতে পারে। আমরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করছি ধর্ষককে গ্রেফতার করার জন্য।’

ধর্ষণের আলামত মিলেছে :ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে প্রাথমিক পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিলেছে বলে জানিয়েছেন ঐ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ। তবে ধর্ষণের ঘটনায় এক না একাধিক ব্যক্তি জড়িত তা নিশ্চিতে ঐ শিক্ষার্থীর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার  জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, মেয়েটিকে হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করে চিকিত্সা চলছে।  তার চিকিত্সার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বোর্ডের প্রধান ঢাকা মেডিক্যালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সালমা রউফ। এছাড়া ফরেনসিক বিভাগ, ইএনটিসহ অন্য বিভাগের চিকিত্সক রয়েছেন বোর্ডে।

সাত সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, তার (ছাত্রী) গলার দুই পাশে নখের আঁচড় দেখা  গেছে। গলা চেপে ধরার কারণে কথা বলতে একটু তার কষ্ট হচ্ছে। নাকের ওপরেও নখের চিহ্ন পাওয়া  গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের এক চিকিত্সক বলেন, মেয়েটির কিছু আঘাত হয়েছে ধর্ষণকারীর দ্বারা, আর কিছু আঘাত হয়েছে ঘটনাস্থলের কারণে। জঙ্গলের কারণে তার পায়ে কিছু আঘাত রয়েছে। বোঝা গেছে যে ধর্ষণকারী তার গলা টিপে ধরেছিল। হাতেও একই ধরনের চিহ্ন আছে যেটা থেকে অনুমিত হচ্ছে যে তাকে  জোর করে আঘাত করা হয়েছে। লাথি মারা হয়েছে এরকম আঘাতের চিহ্নও রয়েছে শরীরে। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সমন্বয়কারী ডা. বিলকিস  বেগম বলেন, ঐ ছাত্রীর চিকিত্সার বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি আমরা। মঙ্গলবার ঐ ছাত্রীর রেডিওলজি (বয়স নির্ধারণ) পরীক্ষা করা হবে। এছাড়া  বোর্ডের সিদ্ধান্তক্রমে আরো কিছু পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করা হবে। মেয়েটি অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের আইজি ও ডিএমপি কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ঘটনাটি শুনেছি, মেয়েটি বেশ রাতে ফিরেছে। তার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করছে। আমাদের কয়েকটি টিম এ নিয়ে কাজ করছে। তবে আমরা এখনো সুনিশ্চিত নই, কি কারণে, কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস: ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় গতকাল সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবাদে যোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। দুপুর একটার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বড়ো মিছিল বের করেন। বেলা ১১টায় টিএসসি থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে দুপুর ২টায় অবরোধ তুলে নেয়। এদিকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় ধর্ষণের বিচারসহ বেশ কিছু দাবি নিয়ে রবিবার রাত থেকে অনশন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সিফাতুল ইসলাম। গতকাল সকালে তার সঙ্গে যোগ দেন সাইফুল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমান নামে আরো দুই শিক্ষার্থী।

ছাত্রলীগের বিক্ষোভ: ছাত্রলীগ বেলা ১১টা থেকে টিএসসি এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত দাস এবং সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।

কুর্মিটোলায় বিক্ষোভ: বেলা সাড়ে তিনটায় অপরাধীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঘটনাস্থলের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বাসে করে শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মানববন্ধন করেন। পরে তারা সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়েন।

উপাচার্যের আশ্বাস: এদিকে ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর পাশে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আছে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো আমাদের প্রথম দায়িত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছে। ঘটনাটি খুবই নিন্দনীয়, দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা মর্মাহত।