ইরানের নিহত জেনারেল কাসেম সোলেইমানির জানাজায় গতকাল রাজধানী তেহরানের রাস্তায় জনসমুদ্র সৃষ্টি হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুক্রবার ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয় সোলেইমানিকে। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। একপর্যায়ে তাকে কাঁদতে দেখা যায়। তেহরান আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকে কঠোর অবরোধের হুমকি দিয়েছেন। খবর বিবিসির
সোলেইমানির জানাজায়
কী হয়?
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়, তেহরানের রাস্তায় বিশাল জনসমাগম হয়েছে জানাজা ঘিরে। সোলেইমানিকে দেশটিতে জাতীয় নায়ক এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। জানাজায় অনেক মানুষকেই কাঁদতে দেখা গেছে। কেউ কেউ সোলেইমানির ছবি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। আল কুদস ইউনিটের বর্তমান প্রধান ইসমাইল ঘানিকেও সোলেইমানির কফিনে মাথা রেখে কাঁদতে দেখা যায়। মানুষ সোলেইমানির কফিন মাথার উপর দিয়ে বয়ে নিয়ে চলে এবং ‘আমেরিকার মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। বিক্ষুব্ধরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পতাকা পোড়ায়। সোলেইমানির মেয়ে জয়নাব সোলেইমানি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘কালো দিন’ দেখবে। ‘পাগল ট্রাম্প, তুমি ভেবো না যে আমার বাবার শাহাদতের মধ্য দিয়ে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে’।
সোমবারের জানাজার পর জেনারেলের মরদেহ শিয়া ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোমে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ মঙ্গলবার কেরমানে তার গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হবে। তেহরানে সোলেইমানির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট রূহানি বলেন, আমেরিকানরা আসলেই বুঝতে পারেনি যে তারা কত বড়ো ভুল করেছে। এই এলাকার ওপর থেকে যেদিন আমেরিকার নোংরা হাত কেটে ফেলা হবে সেদিনই তার রক্তের বদলা পূরণ হবে।
ইরাকের ওপর অবরোধের হুমকি ট্রাম্পের
ইরাকের পার্লামেন্ট দেশটি থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীকে চলে যেতে বলার আহ্বান জানানোর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটির ওপর চরম অবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের খুবই ব্যয়বহুল একটি বিমানঘাঁটি সেখানে আছে। এটা বানাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এর ক্ষতিপূরণ যতক্ষণ না দিচ্ছে তারা, ততক্ষণ আমরা সেখান থেকে যাচ্ছি না।
প্রেসিডেন্সিয়াল প্লেনে বসে ট্রাম্প বলেন, ইরাক যদি সেখান থেকে শত্রুতামূলকভাবে মার্কিন সৈন্যদের চলে যেতে বলে, তাহলে আমরা তাদের ওপর এমন অবরোধ আরোপ করব যা আগে কখনো দেখেনি তারা। এই অবরোধের কাছে ইরানের ওপর আরোপ করা অবরোধকে ম্লান বলে মনে হবে। কথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে তৈরি করা আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের অংশ হিসেবে পাঁচ হাজার আমেরিকান সৈন্য এখন ইরাকে রয়েছে। রবিবার ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিরতি টানে কোয়ালিশন। একই দিনে ইরাকি এমপিরা পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাশ করে, যেখানে বিদেশি সৈন্যদের ইরাক ত্যাগ করার আহ্বান জানানো হয়।
ছয় মাসে পরমাণু বোমা!
ইরান ঘোষণা করেছে, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল তার কোনোটিই তারা আর মেনে চলবে না। জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ইরানের মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এটি এমনিতেই খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। ইরানের এই ঘোষণার পর এই চুক্তি ভেঙে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কত দ্রুত ইরান বোমা তৈরি করতে পারবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, কমপক্ষে এক বছর। তবে ইরান যদি সব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইউরেনিয়াম পরিশোধনের মাত্রা ২০ শতাংশে উন্নীত করে, তাহলে ছয় মাস বা তারও কম সময়ের মধ্যে এটি করা সম্ভব। পরমাণু চুক্তির অন্য দেশগুলো অবশ্য এখনো আশা করছে ইরান ঐ পথে যাবে না। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তারা ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চুক্তিবিরোধী কিছু না করার জন্য।
কঠোর অবস্থানে ইরাকও
কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন কমান্ডার হত্যার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ জানিয়েছে ইরাক। নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠানো আলাদা চিঠিতে এ অভিযোগ জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। এর আগে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করতে পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাশ করেছেন এমপিরা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিলে ইরাক আইনি ব্যবস্থা নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন এক ইরাকি শিয়া এমপি। আনম আল খিজায়ি নামের ঐ এমপি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলে আমার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে আমেরিকান সেনাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে তাদেরকে অপরাধী হিসাবে দাঁড় করানো।
ট্রাম্পের মাথার মূল্য ৮ কোটি ডলার
ট্রাম্পের মাথার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ কোটি ডলার। ইরানের একজন বক্তা এ মূল্য নির্ধারণ করেন। তিনি বলেছেন, কেউ ট্রাম্পের মাথা এনে দিতে পারলে এই পুরস্কার দেওয়া হবে। তবে ঐ ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সোলেইমানি হত্যার বদলা নিতে আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে দেশটির সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
ঘানি কয়েক ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিনিসহ অন্তত ৬০ ইরানিকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ। কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফেরার পথে তাদেরকে আটক করা হয়।
ট্রাম্পের ক্ষমতা কমাতে বিল আসছে কংগ্রেসে
ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক শক্তি কমিয়ে দিতে চায় মার্কিন কংগ্রেস। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব কংগ্রেসে পেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। তিনি বলেছেন, এ সপ্তাহেই যুদ্ধের ক্ষমতা সম্পর্কিত একটি বিল প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপন করা হবে এবং তা ভোটে দেওয়া হবে।
হামলা হলে যুদ্ধাপরাধ হবে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে সরাসরি যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে তুলনা করেছে। তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এই কাজ করেন, সেটা হবে যুদ্ধাপরাধের সামিল। যুদ্ধ সম্পর্কিত যে জেনেভা কনভেনশন, তার ৫৩ ধারার কথা উল্লেখ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কোন ধরনের সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা, এতে একেবারেই নিষিদ্ধ।
ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, ইরান ইস্যুতে ন্যাটো ওয়াশিংটনের পাশে আছে।
