নগর হইতে গ্রাম—সকল স্থানেই শীত ভালোমতো জাঁকিয়া বসিয়াছে। শীতের প্রকোপে আবালবৃদ্ধবনিতা—সকলেরই দুর্ভোগ বাড়িয়াছে। ইহার সহিত বাড়তি হিসাবে দেখা দিয়াছে শীতকালীন নানা রোগবালাই। এই মৌসুমে শীত খানিকটা আচমকাই পড়িতে শুরু করিয়াছে। গত ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত শীত বেশ সহনীয় পর্যায়ে ছিল; কিন্তু হঠাত্ ১৮ ডিসেম্বর হইতে তীব্র শীত শুরু হয়। ইহার মধ্যে আবার শৈত্যপ্রবাহের আক্রমণও ছিল। ফলে শীতকালীন নানা রোগ সারাদেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। শীতকালীন রোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল : শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ, আমাশয়, জন্ডিস, জ্বর, চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ ইত্যাদি। এই সকল রোগে বেশি আক্রান্ত হইতেছে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা। সারাদেশের হাসপাতালগুলি এখন এই সকল রোগীতে ভর্তি। এক হিসাবে, শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে দেশে গত ৬৬ দিনে মারা গিয়াছে ১৭ জন। ইহাদের বেশির ভাগই শিশু। গত বছরের ১ নভেম্বর হইতে গত ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হইয়াছে ৫২ হাজার ১৬৭ জন। ইহার বাহিরে রহিয়াছে হাঁপানি (অ্যাজমা), ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ঠান্ডা, সর্দি ও কাশি। শ্বাসতন্ত্রজনিত সর্দি-কাশি-জ্বরপ্রতিরোধে ডাক্তারদের পরামর্শ হইল—শিশুদের সহিত মেলামেশায় সতর্কতা অবলম্বন, হাঁচি দেওয়ার সময় রুমাল বা টিস্যু পেপার ব্যবহার করা; স্বাস্থ্যকর, খোলামেলা, শুষ্ক পরিবেশে বসবাস করা; তাজা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা, যাহা দেহকে সতেজ রাখিবে এবং রোগপ্রতিরোধে সহায়তা করিবে।
ইহা ছাড়া, গত বত্সরের ১ নভেম্বর হইতে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত কারণে শুধু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়াছে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৮৩ জন। যাহার বেশির ভাগই শিশু। পাশাপাশি এই ৬৬ দিনে জন্ডিস, আমাশয়, জ্বর, চর্মরোগ ও চোখের প্রদাহে আক্রান্ত হইয়াছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬০ জন এবং এই রোগগুলিতে সারাদেশে মারা গিয়াছে ৩০ জন। এই শীতে সকলের চাইতে বেশি আক্রান্ত রোগটির নাম নিউমোনিয়া। ইহা একটি মারাত্মক অসুখ। নিউমোনিয়ায় শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ভুগিয়া থাকে। পৃথিবীব্যাপী পাঁচ বত্সরের নিচের শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ হইল নিউমোনিয়া। বাংলাদেশেও শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ এই রোগটি। যদিও ইহা প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিত্সার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য একটি রোগ, তবুও প্রতিরোধে সতর্কতার বিকল্প নাই।
শীত মৌসুম শেষ হইতে এখনো বেশ খানিকটা বাকি, ফলে এই সকল রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা এখনো থাকিয়া যাইতেছে। ডাক্তারদের মতে, শীতকালীন রোগপ্রতিরোধের প্রধান অবলম্বন হইল সচেতনতা। যেহেতু শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত হইয়া থাকে সেইহেতু তাহাদের আশপাশে পরিবারের যাহারা থাকেন তাহাদের সচেতন হইতে হইবে। বিশেষ করিয়া শিশুর যত্নে অবহেলা করা চলিবে না। পাশাপাশি, রোগের এই মৌসুমে ডাক্তারদেরও আক্রান্তদের প্রতি বাড়তি সদয়তা দেখাইতে হইবে। সর্বোপরি সকলের আন্তরিকতা ও সচেতনতায় এই দুর্যোগ আমরা কাটাইয়া উঠিতে পারিব বলিয়া আশাবাদী।
