পাঁচপাত্তুরও পতন হয়েছিল

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪০

তাপস কুমার দত্ত

দম্ভ, ঔদ্ধত্য, হুংকার কত প্রকার ও কী কী তা বিশ্বের চলমান ঘটনার দিকে চোখ রাখলে স্পষ্ট বোঝা যায়। কেবল মাটির মধ্যে পুঁতে ফেলার হুমকি নয়, অহমিকার চূড়ান্ত রূপ দেখতে পাওয়া যায় কিছু মানুষের মধ্যে। অন্যরা যেন এসব মানুষের চোখে ‘মানুষ’ নয়, কীটপতঙ্গ। যা ইচ্ছা তাই করা যায়, যেভাবে ইচ্ছা পিষে ফেলা যায়।

কিন্তু সত্যিই কি শেষ পর্যন্ত দম্ভ, অহমিকা, হুংকার টিকে থাকে? নিজ ঘরের বিন্দু দিয়েই না হয় সিন্ধু দর্শন করা যাক। গভর্নর মোনেম খান ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই এনএসএফকে সরকারের পেটুয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। এদের একজন নেতা জাহাঙ্গীর ফয়েজ ঢাকা হলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তার সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন সাইদুর রহমান, যিনি পাঁচপাত্তু নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি অবশ্য নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বলতেন ‘পাস পার্ট-টু’, যার অপভ্রংশ হলো—পাঁচপাত্তু। পাঁচপাত্তুর দোসর ছিলেন খোকা নামের আরেক অত্যাচারী। খোকা গলায় একটা জ্যান্ত সাপ পেঁচিয়ে হেঁটে বেড়াতেন, ভয় দেখাতেন। পাঁচপাত্তুর বাড়ি ছিল বরিশালে, খোকার ছিল বগুড়ায়। ক্ষমতার দাপটে হেন অপকর্ম নেই, যা তারা করতেন না। পাঁচপাত্তু ও খোকার চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকত সাধারণ ছাত্ররা। ডাইনিংয়ের ভালো ভালো খাবার নিজেরা শেষ করে তারা এক অর্থে উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখতেন সাধারণ ছাত্রদের জন্য। পাঁচপাত্তুর ঢাকা হলে থাকলেও ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) বাদে সব হলেই তার যাতায়াত ছিল অবাধ। বিশেষ করে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে বেশি যেতেন। একদিন ঐ হলের বার্ষিক ফিস্ট অনুষ্ঠান শেষে পাঁচপাত্তুর সাঙ্গপাঙ্গসহ যখন নেশায় বুঁদ ছিলেন, সে সময় পুরাতন ঢাকার মজনুর নেতৃত্বে হামলা হয় তার ওপর। পরিণতিতে খুন হতে হয় পাঁচপাত্তুকে। মুহূর্তেই পতন ঘটে পাঁচপাত্তুর দম্ভপূর্ণ অলিখিত সাম্রাজ্যের।

একটি ভাত টিপলেই যেমন হাঁড়ির সব ভাতের পরিণতি জানা যায়, তেমনি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়—দম্ভ, ঔদ্ধত্য, হুমকিদাতাদের পরিণতিই শেষ পর্যন্ত প্রহসনে পরিণত হয়। সুতরাং এই ‘বিন্দু’র ভেতর দিয়ে জগতের সিন্ধুকে দেখলে বুঝতে পারি, এই দিন দিন না আরো দিন আছে। যদিও দার্শনিকভাবে বলা হয় যে জগতে শেষ বলে কিছু নেই! কিন্তু শেষ বলে যদি কিছু থাকত, তবে দার্শনিক দিক থেকে সেই শেষটাকে বলা যায়—পতন। অর্থাত্ জগতে সব কিছুর পতনই শেষ কথা। কবি ওমর খৈয়াম যেমন বলেছেন, ‘প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে’ই একদিন। ঔদ্ধত্য কীভাবে পতন ঘটায়, সেটা মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘রসাল ও স্বর্ণলতিকা’ কবিতায় দেখিয়েছেন প্রতীকীভাবে। সেখানে ‘রসাল’ (আমগাছ) অহংকারে গরীয়ান ছিল তার অতি বৃহত্ অবয়ব ও বিস্তৃতি নিয়ে। আর স্বর্ণলতিকা ছিল অতি সামান্য গাছ। কিন্তু কোনো একদিন কালঝড় এসে শিকড় উপড়ে ফেলে রসাল মহিরুহের। অথচ বেঁচে যায় নগণ্য স্বর্ণলতিকা।

মানব ইতিহাসের বিভিন্ন জাতির দিকে দেখলে এটা আরো স্পষ্ট হয় যে হুংকার-ঔদ্ধত্য-অহমিকা-নৃশংসতার শেষটা হয় দুর্ভাগ্যের। আর এটা যদি সেই জাতির কোনো নেতার কারণে হয়ে থাকে, তবে তার খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকেই। যেমনটি হিটলারের জন্য দিতে হয়েছে জার্মান জাতিকে। এজন্য একটি মহাশক্তিধর জনগোষ্ঠীর নেতাকেও হতে হয় অত্যন্ত পরিণত মস্তিষ্কের। তাকে হতে হয় সবচাইতে মানবিক। ধনী হোক, দরিদ্র হোক, সাদা-কালো-বাদামি হোক—জগতের সব মানুষের প্রতি প্রকৃত মূল্যবোধ জাগ্রত থাকতে হয় তাঁর ভেতরে। কিন্তু এর বিপরীতটি হলে সেই নেতার জন্য কোনো না কোনোভাবে খেসারত দিতে হয় ঐ শক্তিশালী জনগোষ্ঠীকে। আর পিষে ফেলার আক্রোশ যদি একজনের বিরুদ্ধে হতো, এক কথা ছিল; কিন্তু এটা যেন গ্রাম্য সেই হিংসুটে ঝগড়াটে বিশ্রী দাম্ভিক শক্তিশালী মানুষটির মতো—যিনি গ্রামের সবার সঙ্গে পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া করতে ও ঝামেলা বাধাতে ভালোবাসেন।

মনে রাখতে হবে, অহংকারভরা হিংস্র জগতের নিয়ম হলো, কোনো পক্ষই চিরকাল বসে বসে শুধু মার খাবে না। এই জগতে যে যত বড়ো প্রতাপশালী হোক না কেন, তার রাজপাটে একদিন গোধূলি ঘনিয়ে আসবেই। এজন্য বিশ্বের নেতৃবৃন্দের উচিত বিশ্বের সাড়ে সাত শ কোটি মানুষের জন্য একটি সুখী বসবাসযোগ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। কিন্তু তা না করে তাদের মধ্যে কারো কারা কার্যকলাপ যদি এমন হয়, যার পরিণতিতে পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে তার বা তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। মানব সভ্যতার ইতিহাস সে কথাই বলে।

n লেখক :সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার 

[email protected]