‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১০

তীব্র শীত উপেক্ষা করে মঙ্গলবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে, কেউবা অপরাজেয় বাংলায়। সবারই এক দাবি, ধর্ষকের ফাঁসি চান তারা। দিনভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বিক্ষোভ মিছিল-মানববন্ধন করে, রাস্তায় আলপনা এঁকে, মুখে কালো কাপড় বেধে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাবিতে ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিভাগ এবং সারাদেশে বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও জেলা পর্যায়েও অসংখ্য সংগঠন ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। দেশে ধর্ষণের ইতি ও ধর্ষকের কঠোর সাজা চেয়েছে তারা।

গত রবিবার রাতে রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় গত ২ দিনেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এর প্রতিবাদে গত দুদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে ঢাবি ক্যাম্পাসে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল সকালে শতাধিক শিক্ষার্থী ব্যানার ফেস্টুন হাতে                    আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করেন। বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ফিন্যান্সসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন স্বতস্ফূর্তভাবে। সকালে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল বের করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন করে শুভসংঘ। দুপুরে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ব্যানারেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। এদিকে রবিবার রাত থেকে ধর্ষণের বিচারসহ চার দফা দাবিতে ঢাবিতে অনশন করছেন ৪ শিক্ষার্থী।

ধর্ষকের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়ে জোবায়দা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা একটি পশুর বিরুদ্ধে আজ রাজু ভাস্কর্য দাঁড়িয়েছি। আমরা আশাবাদী সরকার এর সুষ্ঠু বিচার করবে। সরকার চাইলে পারবে বিচার করতে। আমরা চাই ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হোক।’ রুকাইয়া জান্নাত নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা একজন ধর্ষকের বিচার দাবিতে এখানে দাঁড়িয়েছি। আমরা ধর্ষকের বিচার চাই। সরকার ধর্ষকের বিচার করবে বলে আমরা আশাবাদী।’

ধর্ষককে শনাক্ত করা যায়নি

কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা কাউকে সনাক্ত করতে পারেনি। গ্রেপ্তারও হয়নি কেউ। ২দিন পরও তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। ঘটনাস্থলের অদূরে আর্মি গলফ গার্ডেনের প্রবেশ গেট থেকে নেয়া ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী আসামিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাতে ধর্ষকের ছবি মেলেনি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এরইমধ্যে ভুক্তভোগীর সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলেছেন। তারা ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ধর্ষকের শারীরিক আকৃতি, চেহারা কেমন ছিল সেটি জানার চেষ্টা করছেন। সেই মোতাবেক সন্দেভাজন বেশ কয়েকজনের ছবি এঁকে তাকে দেখিয়েছেন। তবে এসব ছবির মধ্যে ধর্ষকের মিল খোঁজে পাননি ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী।

যদিও নিপীড়নের শিকার ছাত্রী তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বলেছেন, ধর্ষণকারী একজনই, তার বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, স্বাস্থ্য ভাল, উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট বা এর দুই এক ইঞ্চি বেশি হতে পারে। মাথার চুল কোকড়া, সামনের দুটি দাঁত নেই। তবে এখন পর্যন্ত ধর্ষককে শনাক্ত করা যায়নি। তবে সরেজমিনে ঘটনাস্থলের আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই এলাকাটি আগে থেকেই মাদকসেবী, দুর্বৃত্ত ও বখাটেদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সন্ধ্যার পর রীতিমত অপরাধীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। তবে এলাকাবাসী বিষয়টি টের পেলেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তা গুরুত্ব দেননি। এর আগেও ওই এলাকায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

এ সম্পর্কে গতকাল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে পুলিশ সপ্তাহ-২০২০ এর অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, ‘যেকোনো ঘটনার তদন্ত করতে সময় লাগে। তদন্ত তার নিজস্ব যে প্রক্রিয়া আছে সে প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। সময় ধরে তদন্ত হয় না। আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই সবাই মিলে চেষ্টা করছি। আমাদের প্রত্যেকটা টিম অত্যন্ত আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। এটি আমাদের এক নম্বর প্রায়োরিটি।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশের দুটি সিসিটিভির ফুটেজ উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি ফুটেজই ওই সড়কের পাশে লাগানো ক্যামেরার। ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।  এদিকে ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় এজাহার গ্রহণ করেছেন আদালত। এছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখও নির্ধারণ করেছেন। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা মামলার এজাহারটি গ্রহণ করে ২৮ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন।

ধর্ষককে দেখলে চিনতে পারবেন ভুক্তভোগী ছাত্রী

নিপীড়নের শিকার ছাত্রী বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি রয়েছেন। গতকাল তার শারীরিক খোঁজ খবর নিতে গিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি মেয়েটিকে দেখতে এসে তার সঙ্গে কথা বলেছি। মেয়েটি অত্যন্ত সাহসী। সে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। সে জানিয়েছে (মেয়েটি) আসামিকে দেখলে চিনতে পারবে। তার মাঝারি গঠন। তাকে দেখলে সবকিছু সে বলতে পারবে। এছাড়া তার বুদ্ধিমত্তায় আলামত নষ্ট হয়নি। এখন পরীক্ষা করে ডিএনএ মিলিয়ে প্রকৃত ধর্ষককে শনাক্ত করা কঠিন হওয়ার কথা না। সাহস আর মনের জোরের কারণে মেয়েটির অবস্থার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে।’

ধর্ষণের শিকার মেয়েটির শারীরিক অবস্থা উন্নতি করছে। ২/৩ দিনের ভেতরে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাত সদস্যর মেডিকেল বোর্ড মেয়েটিকে দেখেছে। ফাইনালি তারা তার ফিজিক্যাল কন্ডিশনের কোনো ট্রমা পাননি। উনি মানসিকভাবে যথেষ্ট ডিপ্রেসিভ ছিলেন। আমাদের মনোচিকিত্সক আছেন তিনি কিছু ম্যানেজমেন্ট দিয়েছেন। সার্বিকভাবে আগের দিনের চেয়ে স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে।’

অনশন-বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস

ধর্ষণের প্রতিবাদে ঢাবি ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ১৪-১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আরম্ভ হওয়া এ মানবন্ধন শেষে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন তারা।

ডাকসুর নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ

এদিকে ধর্ষণের প্রতিবাদে নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চ তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। মঞ্চ থেকে ধর্ষণ ও শিক্ষার্থী নিপীড়নবিরোধী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে ডাকসু। এছাড়া গতকাল বিকেল ৩টায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ডাকসুর পক্ষ থেকে নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

আলপনা এঁকে প্রতিবাদ

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে আল্পনা এঁকে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে চারুকলা অনুষদ ছাত্রলীগ। রোকেয়া হলের সামনে আল্পনা আঁঁকা শুরু হয়, যা সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে শেষ হয়।  আলপনা কর্মসূচিতে এসে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘নেতাকর্মীদের বলে দিয়েছি, কেউ যদি আমাদের বোনদের অশালীন কথা বলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতে। আজ বুধবার ঢাকা মহানগরসহ সব জেলা ইউনিটগুলোকে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

জবি সংবাদদাতা জানান, ধর্ষণের প্রতিবাদে গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ব্যানারে দফায় দফায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুর ১২টায় বিভিন্ন বিভাগের মেয়েরা শহিদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

বরিশাল অফিস জানায়, গতকাল বরিশালেও বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফ্রন্টের যৌথ উদ্যোগে গতকাল নগরীর ফকির বাড়ি রোড থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।

কুবি সংবাদদাতা জানান, কুবির মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মাজেদ, কুবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক তানভীর সাবিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ইবি (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, একই দাবিতে গতকাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হন। কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের আফরিন আজিজ, বাংলা বিভাগের জি কে সাদিক, নুরুন্নবী ইসলাম সবুজ, ফাতেমা খাতুনসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে গতকাল রাজবাড়ীতে সাধারণ ছাত্র ঐক্য পরিষদ মানববন্ধন করেছে। এতে বক্তব্য রাখেন মো. আতিকুর রহমান (হাসান), সহকারী শিক্ষক রঞ্জন কুমার রুদ্র, ছাত্রনেতা মো. নুর ইসলাম, নাইমুর রহমান, অরুপ রুদ্র, রিয়াজ ফকীর, আলাউদ্দিন প্রমুখ।