চলতি দশকের শেষ দিকে আসিয়া বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল পরিস্থিতির মুখে পড়িয়াছে। বিশ্বমন্দার যে অভিঘাতের কথা বলা হইয়াছিল তাহা বুঝি আর কোনোভাবেই এড়ানো গেল না। বিশ্লেষকদের ধারণা, খুব দ্রুতই বিশ্ব এক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে যাইতেছে। আর্থিক খাতের এই পরিস্থিতির জন্য মূলত রাজনীতিই দায়ী। রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট ঘটনাবলি আজ অর্থনীতির জন্য কাল হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সেই কারণেই বলা হয়, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে আড়াআড়ি রাখিয়া সফল হওয়া যায় না। বোধকরি অর্থনৈতিক কূটনীতি শব্দটি জনপ্রিয় হইবার ইহাই মূল কারণ। আর অর্থনৈতিক কূটনীতি সঠিকভাবে না আগাইলে পরিস্থিতি খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। আজকের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট যাহার বাস্তব উদাহরণ।
একটু পিছনে তাকাইলে দেখা যাইবে শুরুটা ছিল চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ। ইহাতে অপরের পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করিয়া বাণিজ্যব্যবস্থাকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। ইহার প্রভাবে ছোটো অর্থনীতির দেশগুলিতেও সংকটের রেখাপাত ঘটে। পণ্যবাজার শেয়ারবাজার স্বাভাবিক গতি হারায়। ঐদিকে ইউরোপে ব্রেক্সিট কাণ্ড। ২০১৭-১৮ সালের পর ইউরোপের বড়ো দেশগুলোর আয়ে ছন্দপতন ঘটে। কমিয়া যায় ভোক্তার ব্যয়-সক্ষমতা। যাহার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ ছোটো রপ্তানিকারক দেশগুলির উপর। ইহার ‘চেইন ইফেক্টে’ বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাইবে এমন পূর্বাভাস খোদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) দিয়াছে। এশিয়ার প্রভাবশালী অর্থনীতির দেশ চীনের প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমিয়াছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও তাই। অর্থনীতি ঠিক রাখিবার জন্য বিভিন্ন দেশ সুদের হার কমাইয়াও ভালো প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করিতেছে। এই অবস্থায় সর্বশেষ যোগ হইয়াছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। ইরান ইরাক প্রশ্নে মার্কিন নীতি তথা মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সংকট ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াইয়া দিয়াছে। বাড়িয়াছে স্বর্ণের দাম। জ্বালানি তেলের দাম আরো বাড়িবে এমন কথা শোনা যাইতেছে। সংকট মোকাবিলা না হইলে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাইলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া অনেক দেশের পক্ষেই সম্ভব হইবে না। বাংলাদেশের কথাই যদি বলি আমদানিনির্ভর দেশটি বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাইবার কতটুকু সামর্থ্য রাখে, তাহা সহজেই অনুধাবনযোগ্য। ইতোমধ্যে রপ্তানি আয়ে ভাটা দেখা দিয়াছে। উত্পাদনমুখী খাতে পিছাইয়া থাকা দেশটি এখনো সরল সুদ ও সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করিতে পারে নাই। অর্থসংস্থানের অভাবে বড়ো প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হইতেছে। শুধু রেমিট্যান্সের উপর ভর করিয়া টিকিয়া আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বিশ্বপরিস্থিতি খারাপ হইলে রেমিট্যান্স-প্রবাহ কমিয়া যাইবে। জনশক্তি প্রেরণেও বিঘ্ন ঘটিবে। তাই ব্যাপক বেকারত্বের এই দেশে বিকল্প ভাবিয়া ত্বরিত পদক্ষেপ জরুরি। যাহাতে বিশ্বমন্দার চরম অভিঘাত হইতে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভবপর হয়।
