মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলিয়াছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাস হয়তো এই শতক পর শেষ হইয়া যাইতে পারে। অর্থাত্ মানবজাতি তাহার নিজের তৈরি অত্যাধুনিক আবিষ্কারের নিচে চাপা পড়িতে পারে। আরো ভয়ংকর কথা হকিং বলিয়াছেন। তাহার মতে, ‘অস্তিত্বরক্ষার এই লড়াইয়ে মানুষ এখন হারা যুদ্ধে লড়াই করিতেছে।’ অর্থাত্ মানুষ নাকি পরাজিত হইয়াই রহিয়াছে, শুধু ভিতরে ভিতরে শেষ চেষ্টা চলিতেছে অস্তিত্ব রক্ষার। অন্যদিকে আরেক বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলিয়াছেন, ‘মানুষকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু পরাজিত করা যায় না।’ শিল্পসাহিত্যের দৃষ্টিতে ‘পরাজিত’ না হইবার হয়তো বিশেষ তাত্পর্য থাকিতে পারে; কিন্তু ‘ধ্বংস’ হইলে আর কীইবা বাকি থাকে? এই আশঙ্কাতেই হকিং বলিয়াছেন, শেষাবধি মানুষ তাহার আবিষ্কৃত ভয়াবহ সকল মারণাস্ত্র, যুদ্ধবিগ্রহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড ভাইরাস-সমেত বিভিন্ন উপাদানে পরিপূর্ণ একটি ধ্বংসের গালিচা দিয়া হাঁটিয়া চলিতেছে।
হকিংয়ের মতো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিচক্ষণ মানুষের মনেও গভীর জিজ্ঞাসা রহিয়াছে— পৃথিবী হইতে সত্যিই কি মুছিয়া যাইবে মানবজাতির চিহ্ন! মূলত, প্রস্তর যুগ হইতে মানুষ নিজের জীবনকে আরো সহজতর করিবার জন্য লৌহ-ব্রোঞ্জের পথ ধরিয়া আধুনিক এবং অতি আধুনিক যুগে পা রাখিয়াছে। হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া অধিকতর উত্কর্ষ সাধন করিতে করিতে আজকের বিজ্ঞান হইয়া উঠিয়াছে বিস্ময়ের আকর। ইহার সহিত বিজ্ঞান হইয়াছে শক্তি ও ক্ষমতার প্রতিভূ। সুতরাং তাহা নিরঙ্কুশভাবে কেবল শান্তি সুখ আনয়ন করে নাই, ধ্বংসের ঘ্রাণও ছড়াইয়াছে এই বিশ্বের কোণে কোণে। দুঃখের কথা হইল, আধুনিক বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রযন্ত্র তাহার প্রয়োজনকেই শেষ কথা মনে করিয়া থাকে। সেই কারণে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ওপেনহেইমার ও আন্দ্রেই শাখারভসহ যে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা অপরিহার্য ছিল তাহারা ইহার বিভীষিকার কথা ভাবিয়া নিজেদেরই সৃষ্টির বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিলেন। বিশ্বে এখন যে পরিমাণ পরমাণু বোমা রহিয়াছে তাহাতে ৩৩ বার পৃথিবীকে ধ্বংস করা যাইবে। ইহার সহিত আমরা দেখিতে পাই, ইশপের গল্পের একটি হরিণছানাকে শিকার করিবার জন্য সিংহের হাস্যকর অজুহাত। অনেকে মনে করেন, সাদ্দামের নিকট যদি সত্যিই ভয়ংকর অস্ত্র থাকিত তাহা হইলে পরাশক্তিধররা ইরাক আক্রমণে দ্বিধা করিত। আর এই কারণেই সকল ধরনের স্যাংশন উপেক্ষা করিয়া উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের মালিক হইতে মরিয়া হইয়াছিল। মরিয়া ইরানও। আমরা দেখিয়াছি দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ পরমাণু শক্তিধর হইবার পর শক্তির ভারসাম্য রক্ষার্থে তাহার প্রতিপক্ষ দেশটিও সর্বশক্তি দিয়া মরিয়া হইয়া উঠিয়াছিল পরমাণু শক্তিধর হইতে।
এই কারণে অনেকে মনে করেন, পরমাণু অস্ত্র এমন এক তুরুপের তাস যাহার অর্জন যতখানি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন, তাহা অপেক্ষা অধিক প্রয়োজন যুদ্ধ আটকাইবার জন্য; কিন্তু সকল কথার শেষ কথাই হইল, এতসব তুরুপের তাস সকলের হস্তগত হইবার পরও এই বিশ্ব কি রক্ষা পাইবে? নাকি সত্যি হইবে হকিংয়ের অনুমান?
