বরিশালের রয়ানী পালায় মুগ্ধ শ্রোতা দর্শক

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২০, ২২:২০

দক্ষিণবঙ্গের বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে রয়ানী গান নামে পদ্মাপুরাণের জনপ্রিয় পরিবেশনা রীতি প্রচলিত রয়েছে। গতকাল বুধবার শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উত্সবে দর্শনীর বিনিময়ে মঞ্চস্থ হলো রয়ানী পালা ‘বেহুলা লখিন্দর’। ঢাকার দর্শকরা বরিশালের এই ভিন্ন রীতির পরিবেশনা দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। বিজয়গুপ্ত-এর রচনায়, ইন্দ্রজিত কীর্তনীয়া’র পরিচালনায় এবং বরিশালের মা মনসা সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্যটি মঞ্চস্থ হয়।

বিশেষজ্ঞের মতে, রয়ানী শব্দটি রওয়ানা বা যাত্রা অর্থে ব্যবহূত হয়। আবার জাগরণ পালা হিসেবে রয়ানী শব্দটি প্রচলিত আছে। সারাদেশে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার মধ্যে এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিবেশনা রীতি। যেখানে সাধারণত পুরুষরাই অভিনয় করে থাকেন। পুরুষরাই নারী সেজে অভিনয় করে থাকেন। রয়ানী গানের দলে পুরুষেরা প্রধানত বাদ্যযন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে দু-একটি ক্ষুদ্র ও হাস্যরসাত্মক অভিনয়ের ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্রী দল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো পুরুষ শিল্পীকে অভিনয়ে অংশ নিতে দেখা যায়। শুরুতে বাদ্যযন্ত্রীরা আসরে এসে ভক্তি করে প্রণাম করে হারমোনিয়াম, বেহালা, খোল, করতালের সম্মিলিত সুরে যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করেন। উক্ত সময়ে নারী গায়েনেরা বন্দনাগীতে মনসা দেবী, বিভিন্ন দেব-দেবী, মুনি-ঋষি, শিক্ষাগুরু, চতুর্দিকের দর্শকদের বন্দনা করেন। বর্ণনাত্বক গীতের মাধ্যমে রয়ানী গানের আখ্যান পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সরকার ইন্দ্রজিত কীর্তনীয়া, সহশিল্পী প্রবীর বিশ্বাস ননী, শ্যামলী, ঊষা রানী ও রঞ্জতা রানী কীর্তনীয়া। যন্ত্রে সহযোগিতা করেছেন পতিত মিস্ত্রী, অরুণ মালি, সুমন্ত চন্দ্র বড়াল, শঙ্কর ব্যাপারী, সঞ্জয় হাওলাদার, রমনি সহজাল এবং কমল মণ্ডল।

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উত্সবের ষষ্ঠ দিনে ছিল পটুয়াখালী, বান্দরবান ও নরসিংদী জেলার শিল্পীদের পরিবেশনা। শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ঢাকার পরিবেশনায় অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এর পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিল্পী শুসমী এবং শিশু শিল্পী সাদিয়া সেমন্তী শ্রেয়সী একক সংগীত পরিবেশন করে। এম আর ওয়াসেকের নৃত্য পরিচালনায় ‘বারো মাসে তেরো পার্বন এবং চলো এগিয়ে যাবো’ গানের কথায় দুটি সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নন্দন কলাকেন্দ্র। সমবেত সংগীত পরিবেশন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ এবং একক আবৃত্তি করেন শিল্পী আহকামউল্লাহ।

পটুয়াখালী জেলার শিল্পীদের পরিবেশনা ছিল নন্দন মঞ্চে। ‘বুকের ভেতর আকাশ নিয়ে এবং বাজেরে বাজে বাংলাদেশের ঢোল’ গানের কথায় দুটি সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পী মো. বায়েজীদ, শোভন, পারভেজ, সাইদুল, মুচকান, শান্তা, স্বর্ণালী, মিতু ও মৌ; ‘চলো স্বাধীন পথে এবং শোন একটি মুজিবরের থেকে’ গানের কথায় দুটি সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বাদল, সিফাত, জুয়েল, নিলয়, হূদয়, মালা, পুতুল, অনামিকা, দীপান্বিতা ও মনিকা; একক সংগীত ‘দূর আযানের মধুরও ধ্বনি বাজে’ পরিবেশন করে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী মালা কর্মকার এবং উপজেলা পর্যায়ের শিল্পী পুতুল মিত্র পরিবেশন করে ‘ওগো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মানুষ’; যন্ত্রে ‘কলো কেলা ছলো ছলো নদী করে টলো মলো’ সুর তোলেন যন্ত্রশিল্পী আরিফ, শেখর, পুতুল ও রঞ্জিত। এছাড়া, বান্দরবান জেলার পরিবেশনা শুরু হয় ‘আকাশ ছোঁয়া চিম্বুকে আয় হাত ছানি দেয় বনে’ গানের কথায় সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বীণাপানি চক্রবর্তী, লিজা সংমা, সুমাইয়া আক্তার, রুম্বাতি ত্রিপুরা, দেবী দিপ্ত রূপা, ঐশী, দিলীপ নাথ, মো. হারুন, মান্নান আহমেদ ও জাহাঙ্গীর আলম; একিনু মারমার নৃত্য পরিচালনায় ‘মারমা বর্ষবরণ; ঐতিহ্যবাহী চাকমা দলীয় নৃত্য এবং বম পুষ্প নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পী আইভি বম, শিউলী বম, জেনেট বম, আদর বম, জসাইমে, মেসাইচাং, হ্লাএচিং ও হ্লাএনু; একক নৃত্য পরিবেশন করেন জাতীয় পর্যায়ের নৃত্যশিল্পী একিনু মারমা;  একক সংগীত লালন গীতি পরিবেশন করেন শিল্পী দেবী দীপ্ত রূপা ঐশী; জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী একিনু মারমা; উপজেলা পর্যায়ের শিল্পী সুমাইয়া আক্তার উমে এবং তবলায় সহযোগিতা করেন শিল্পী শংকর দাস। এদিকে, নরসিংদী জেলার পরিবেশনা শুরু হয় ‘মুক্তির মন্দির সোপান তালে এবং নরসিংদী মোর জন্মভূমি’ গানের কথায় দুটি সমবেত সংগীত; ‘দে তালি বাঙালি এবং জাগো বাংলাদেশ’ গানের কথায় দুটি সমবেত সংগীত; একক সংগীত পরিবেশন করে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী মেহরীন; উপজেলা পর্যায়ের শিল্পী রাবেয়া আক্তার সেতু এবং ত্রিতালে তবলায় লহরা পরিবেশন করেন যন্ত্রসংগীত শিল্পীবৃন্দ।