নারীর প্রতি সহিংসতা

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ২২:০০

নারীর প্রতি সহিংসতা কোনোভাবেই কমছে না। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? জানতে চাওয়া হয়েছিল পাঠকদের কাছে। ই-মেইল এবং টেলিফোনে পাঠকের দেওয়া প্রতিক্রিয়া আজ প্রকাশ করা হলো।

বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধা—সব বয়সেই নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়। মহিলা পরিষদ রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গেছে, গত বছর দেশে ১ হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রয়োজন সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা ও যথাযথ প্রয়োগ।

মো. হানিফ মিয়া

মনেশ্বর লেন, হাজারীবাগ, ঢাকা।

দেশে উন্নয়ন ব্যাপক দৃশ্যমান হলেও পাশাপাশি মানুষের মনুষ্যত্বের বিষয়টি জাগিয়ে তুলতে হবে।

আমরা মনে করি ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি উপলব্ধি আনা জরুরি যে নারী ভোগ্যপণ্য নয়। এছাড়া ধর্ষণ কমাতে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও মূল্যবোধের সচেতনতা।

সালমা আফরোজ

ফার্মগেট, ঢাকা।

নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ মাদকাশক্তি, বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব এবং বিকৃত যৌনতা। সামাজিকভাবে কোনো তীব্র প্রতিরোধ গড়ে না উঠার কারণে এই সহিংসতা এবং হিংস্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জন্য সমাজ চেতনতা, নৈতিকতার পূর্ণজাগরণ এবং আইনের কঠোরতা প্রয়োজন।

মাখরাজ খান

সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ।

গত রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানী কুর্মিটোলা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণ হয়েছে। এরকম ধর্ষণের ঘটনা প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় আছে। এ যেন মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি এক রিপোর্টে জানা যায়, ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৩৫৬ জন ও শিশু নিহত ২২৭ জন, আর ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিশু ৯০২ জন এবং হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ২৮০ জন শিশুকে। যে হারে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন বটে, ধর্ষণের ঘটনা বাড়ার পেছনে আমরা মনে করি বিচারহীনতার সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পরিবার থেকেই নারীর প্রতি সম্মানবোধ ও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

হোসনে আরা বাশার নীলা

সাংগঠনিক সম্পাদিকা

নারীর কথা, হাজারীবাগ, ঢাকা।

নারীর প্রতি সহিংসতার যে কারণ সেটি হচ্ছে—পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি। যত দিন না নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি না পালটাবে ততদিন পর্যন্ত সহিংসতা কমবে না। নারী কোনো ভোগ্যপণ্য নয়। নারী-মানুষ এই বিষয়টি প্রতিটি ঘরে পুরুষ শিশু সন্তানকে আদর্শনীতি, শিক্ষা দিতে হবে।

আলিম-উর-রহিম

আইন বিভাগ

গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার।

নারীর প্রতি সহিংসতা-নিপীড়ন বেড়েছে প্রকটভাবে। বিশেষত পথেঘাটে, গণপরিবহনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা অনলাইনে, আর অবশ্যই ঘরে-পাড়ায়। পারিবারিক নির্যাতনও কমেনি। তবে দু-একটি ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচারপ্রক্রিয়া গত বছরটিকে আলাদা করেছে। আমি মনে করি ,নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মানসিকতার পরিবর্তন খুবই জরুরি। আর এ মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য পরিবার থেকেই কাজ কারতে হবে। আমরা যদি আমাদের ছেলে সন্তানদেরকে  নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শিখাই এবং পুরুষরা যদি নারীর প্রতি সহিংসতা থেকে বিরত থাকি, তাহলে সমাজ থেকে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব।

অমিত বণিক

উত্তরা, ঢাকা।

পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিনে চোখ রাখলে নারী ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, হত্যা, অপহরণ কিংবা নিখোঁজের খবর যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ক্রমেই এই হার বেড়ে চলেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, নৈতিক অবক্ষয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসততা এই নেপথ্যের অন্যতম কারণ। নারীর প্রতি অনেক পরিবারের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে যে কোনো অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যা কি না নারী সহিংসতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনের যথা প্রয়োগ, পরিবারে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া ও জনসাধারণের সোচ্চার ভূমিকা একান্ত জরুরি।

তানভীর আহমেদ রাসেল

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশের জন্য ধর্ষণ একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত  হয়ে গেছে। পত্রিকার পাতা খুললেই নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো হাজারো মর্মান্তিক ও কুিসত ঘটনায় ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে নারীর বুক। প্রাচীনকাল থেকেই নারীকে কেন ভোগের সামগ্রী বা যৌন ক্ষুধা মেটানোর বস্তু মনে করা হয়? আমরা শিক্ষা-দীক্ষায় এবং উন্নত মস্তিষ্কের প্রাণী হয়েও পশুর মতো আচরণ করে থাকি। এটা পুরো জাতি তথা পুরো বিশ্বের জন্য চরম গ্লানিকর। ২০১৯ সালের ধর্ষণের পরিসংখ্যান জরিপে দেখা যায় যে, প্রায় ১৫ শতাধিক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন! আরো কত না জানা বা গণমাধ্যমের আড়ালে ঘটে গেছে ধর্ষণের মতো হাজারো ন্যক্কারজনক ঘটনা। নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন এবং ধর্ষণ বন্ধে সরকারের আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্ষকের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত  করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দেশ তথা বিশ্ব উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সর্বপ্রথম নারীকে নিরাপত্তা দিতে হবে। যাতে আর কোনো নারীকে ধর্ষণের শিকার না হতে হয়। যাতে আর কোনো নারীর বুক ভয়ে আঁতকে না ওঠে। নারীর পথচলা হোক নিরাপদ এবং ভয়মুক্ত।      

তাসনীম তামান্না  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  

পুরুষশাসিত এ সমাজে নারী নির্যাতন ও সহিংসতা একটি বিশাল ব্যাধি। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অশিক্ষা, সামাজিক অবক্ষয়, মানবিক মূল্যবোধের অভাবসহ নানা কারণে নির্যাতিত হচ্ছে নারী। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে অসংখ্য নারীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, তালাকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ ও কার্যকর প্রয়োগ নেই। তাছাড়া এসব আইন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সচেতনও নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, পৃথিবীব্যাপী এসব সহিংসতার শিকার হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য নারীর মৃত্যু হচ্ছে। কারণ তারা মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না, তাদের কথা বলতে দেওয়া হয় না। নির্যাতিত হওয়ার পর তাদের থাকতে হয় চাপের মুখে।

মো. জিল্লুর রহমান

সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

আমি মনে করি, নারী নির্যাতনের মূলে রয়েছে পুরুষের ক্ষমতা এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সহিংসতা কমাতে হলে ছোটো বয়স থেকেই শিশুকে নারীর প্রতি সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে, মেয়েশিশুর অধিকার সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেয়েরা নিজেরাই তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। সচেতনতা গড়ে তোলার কাজটি প্রথমত নিজের বাড়ি থেকে শুরু করতে হবে। ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই সচেতনতা প্রয়োজন।

মেনহাজুল ইসলাম তারেক

মুন্সিপাড়া, পার্বতীপুর, দিনাজপুর।

ঘরে-বাইরে, হাটবাজার, স্কুলকলেজ, মাদ্রাসায় শিক্ষক থেকে দিনমজুর, কোথাও কারো কাছেই নারী নিরাপদ নয়! যদিও দেশের আইন পাশ করার প্রধান ও প্রথম দিকের চেয়ারগুলো আজও নারীরই দখলে। আমি মনে করি, বিচারহীনতার সংস্কৃতিই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তাই এই ঘটনা থেকে একটি রাষ্ট্রের সরকার, প্রশাসন এবং জনগণ—কেউ দায় এড়াতে পারে না। মানুষ নামের পশুগুলোকে মানুষরূপে ফেরানোর জন্য সরকার আর প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা দরকার।

বিলকিছ আক্তার

সরকারি ম্যাটস, টাঙ্গাইল।

১৯৬০ সাল থেকে সমগ্র পৃথিবীতে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ২৫ নভেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন দূরীকরণ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই ২৫ নভেম্বর যেতে না যেতেই আমরা মুখোমুখি হচ্ছি নৃশংস নারী নির্যাতনের। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের শ্রমজীবী যুবতি ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হূক্ত হস্তে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।  অপরদিকে আমাদের নিজ দেশে নারী নির্যাতনের হার ৫১ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিনা বাধায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত দোষীকে চিহ্নিত করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবে এই প্রত্যাশাই করি।

ভূঁইয়া কিসলু বেগমগঞ্জী (মজির)

চৌমুহনী, হাজীপুর,

বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী।

নারীর ওপর সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। নারী ধর্ষিত হচ্ছে, খুন হচ্ছে, আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। নারীর প্রতি যৌনতাভিত্তিক সহিংসতা একটি বড়ো ধরনের সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিপরীতে কীভাবে বিচার করতে হবে, সেদিকে নজর দিতে হবে। যখন বিচার হয় না, তখনই ধর্ষণে উত্সাহিত হয় একজন অপরাধী। সে কারণেই অপরাধীদের কঠিন বিচারের আওতায় আনতে হবে। নারীদের সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে পরিবার, সমাজ, বিচার বিভাগ ও সরকারকে যার যার অবস্থানে থেকে এ অন্যায় রোধে কাজ করতে হবে। তবেই এর একটা সুরাহা হবে বলে আমি মনে করি।

মোহাম্মদ শহীদউল্যা

হক ভিলা, মেরাদিয়া,

সিপাহীবাগ, ঢাকা।

প্রখ্যাত ও বরেণ্য কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘নারী বিধাতার ছাঁয়া, নহে সে কামিনী, তাঁকে স্রষ্টার অনুমানি’’। এরকম বহু লেখক/কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সাহিত্যিকেরা নারীকে নিয়ে বহুভাবনা বহুরূপে রূপায়িত করেছেন। অথচ সেগুলো আজ কেউই উপলব্ধি করেন না। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা/ভালোবাসা সৌহার্দপূর্ণ আচরণ/সহমর্মিতা ইত্যাদি বিষয়গুলো আমরা ভুলতে বসেছি। একজন নারী কখনো সে কন্যা, কখনো স্ত্রী, কখনো সে মা। অর্থাত্ নারীরাই হচ্ছে মায়ের জাত। অথচ আজ তাদের প্রতি সহিংসতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। নারী ও শিশু কন্যা ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সহিংসতা রোধে দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই পরিবর্তন অপরিহার্য। বাংলাদেশে সংবিধানে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০ এর ৯ ধারায় বলা হয়েছে যদি কেউ নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করে তাহলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হবে। তাই আমরা প্রত্যাশা করব—নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক প্রতিরোধ ও মূল্যবোধকে সবার আগে গুরুত্ব দেয়া ও অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা।

সুলতানা জামান

মানিক নগর, ঢাকা।

নারীর প্রতি সহিংসতার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : নারীদের অনিরাপদ-অবাধ চলাফেরা, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, বিচারহীনতা। দু’একটি ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ইত্যাদির মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হয় না। সহিংসতা রোধে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। যেখানেই নারীরা থাকে সেখানেই তাদের কার্যকর প্রতিরোধ কমিটি থাকলে সংগঠনিকভাবে মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে। সেই সঙ্গে সহিংসতাও কমে আসবে।

মোহাম্মদ ইসলাম

পুরানা পল্টন, ঢাকা।