রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধিকে স্থায়ী রূপ দিতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সকলের ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। জাতীয় ঐকমত্য ব্যতীত শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না। শত প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি ও বৈরিতার মধ্যেও দেশে সুশাসন সুসংহতকরণ এবং গণতন্ত্র চর্চা ও উন্নয়নে কর্মসূচিতে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের ২০২০ সালের প্রথম অধিবেশনে (শীতকালীন) ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ১৬৩ পৃষ্ঠার ভাষণের সংক্ষিপ্তসারে রাষ্ট্রপতি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের কার্যক্রম ও সাফল্য তুলে ধরেন। তার দীর্ঘ ভাষণের সময় সংসদ সদস্যরা মুহুর্মুহ টেবিল চাপড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে উত্সাহিত করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর স্পিকার সংসদ অধিবেশন আগামী সোমবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সমুন্নত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুজ্জ্বল রাখতে দেশ থেকে দুর্নীতি-সন্ত্রাস-মাদক ও জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে বাঙালি জাতিকে আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এ বছর আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। আমাদের দৃষ্টি ২০২১ সাল ছাড়িয়ে আরো সামনের দিকে, ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে— এটাই জাতির প্রত্যাশা। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, সুশাসন এবং সমাজের সকল স্তরে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনসহ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হব।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় ঐকমত্য ব্যতীত শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ নিতে পারে না। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সকলের ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমি উদাত্ত আহ্বান জানাই। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সফল বাস্তবায়নে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি সরকারিদল ও বিরোধীদল নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সকলকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিষ্ঠান এই মহান জাতীয় সংসদে যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে সরকারের উন্নয়ন-সফলতা-অগ্রগতি এবং আগামী দিনের মহাপরিকল্পনার কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। অধিবেশন এক ঘণ্টার মুলতবির পর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে স্পিকার রাষ্ট্রপতির আগমনের ঘোষণা দিলে সশস্ত্র বাহিনীর একটি বাদক দল বিউগলে ‘ফ্যানফেয়ার’ জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্ভাষণ জানান। স্যুট-কোট পরিহিত রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানান। সংসদে রাষ্ট্রপতির জন্য স্পিকারের ডান পাশে চেয়ার রাখা হয়।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণের শুরুতে জাতির পিতাসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদ, জাতীয় চার নেতা এবং স্বাধীনতাপরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মুজিববর্ষ উদ্যাপনের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ বছর উদ্যাপিত হবে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। জাতির পিতার জীবনাদর্শ, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তার অব্যাহত সংগ্রাম, নির্ভীক, দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব এবং তার গভীর দেশপ্রেম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত। নতুন প্রজন্মের কাছে এবং জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে জাতির পিতার জীবনাদর্শ ও কর্ম বিশেষভাবে উপস্থাপনের জন্য মুজিববর্ষ উদ্যাপনের বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করে আবদুল হামিদ বলেন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশে দারিদ্র্যের হারও দ্রুত কমে এসেছে। দুর্নীতি, জুয়া, মাদক, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে এবং জনজীবনে স্বস্তি বিরাজ করছে।
সরকারের উন্নয়ন ও সফলতা তুলে ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ আজ এশিয়ার সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। পরপর তিনটি অর্থবছরে ৭ শতাংশের বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে, গত এক দশকে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে তিন গুণ।
রাষ্ট্রপতি বলেন, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সার্থক উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের যাত্রা পথে আলোর দিশারি। অনেক বাধা ও ষড়যন্ত্র পেরিয়ে তার বলিষ্ঠ ও প্রত্যয়ী নেতৃত্বে জনকল্যাণমুখী আধুনিক বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের উন্নয়ন-বিস্ময়। আর্থসামাজিক সকল সূচকে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল। বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত্ নাগরিকদের জন্য উন্নয়ন ও অগ্রগতি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই না হলে তা অর্থবহ হবে না। এ উপলব্ধি থেকে প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ অনুমোদন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্মীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে জনগণের নৈতিক মান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সহকারে স্ব স্ব ধর্মচর্চা করতে পারে সে ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর। শিক্ষা বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা জাতির সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। শেখ হাসিনা শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও সময় সাশ্রয়ী সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেতু বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে এবং ২০২১ সালের জুন নাগাদ সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। তিনি বলেন, এই সেতু এশিয়ান হাইওয়েতে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্কসহ দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
গত এক বছরে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সফলতার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রণীত পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রী সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্য প্রতিঘাত ও শরণার্থী সমস্যা জর্জরিত বর্তমান বিশ্বের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে কূটনৈতিক সফলতার আরো একটি বছর। বিশ্ব শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন, নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। তিনি বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ মিয়ানমারের ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাময়িকভাবে আশ্রয় প্রদান করেছে। এতে পুরো অঞ্চলটির জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকরা যেন মিয়ানমারে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে পূর্ণমর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসিত থাকতে পারেন, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ও কার্যকর উদ্যোগ কামনা করি।
