নাসরীন মুস্তাফা
মিনার্ভা নাম বেড়ালটার। সাদা ধবধবে তুলো তুলো শরীরে বাদামি মোম রঙে আঁকা আদুরে টান টোন। যখন এ বাড়িতে এসেছিল, তখন বয়স কেবল এক মাস। নিচু স্বরে মিঁয়াও আওয়াজে কথা বলত। খেতে চাইত আসলে। পেট ভরলেই নিজেকে জিভ দিয়ে চেটেচুটে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ত কাগজের কার্টনে।
কিছুদিন পর কার্টনের সাইজে কুলাল না বলে বেরিয়ে এলো। গোটা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। খাটের নিচে, আলমারির উপরে, জানালার কার্নিশে পায়চারি, বসবাস— আসলে রাজত্ব দখল করছিল সামর্থ্য নিয়েই।
বাড়িতে আগে যেসব ইঁদুর বেড়াতে আসত, তারা সব মাথামুণ্ডু হারিয়ে নাই হয়ে গেছে দুনিয়া থেকে। তেলাপোকারাও বিলুপ্তপ্রায়। বাড়ির বাইরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে আজকাল কান খাড়া করে শোনে। কেন শোনে, তার প্রমাণ দিতেই একদিন দরজাটা খোলা পেয়ে ছুট দিল আর কুকুরের দলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল রাজার মতো। বুকে চেপে ধরে সরিয়ে নিতে নিতে খামচি খেতে হলো অগুনতি, কেন নিয়ে এলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে? কেন? কেন? মিঁয়াও!!
দরজার বাইরে যাওয়ার পাগলামি বেড়ে গেল দিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। মেজাজ-ডাঁটও বেড়ে গেল দ্বিগুণ। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে খাওয়ার আগ্রহ। সারাক্ষণ খাইখাই। খেতে দাও। খেতে দাও। তোমরা কী খাচ্ছ? আমিও খাব। মিঁয়াও!!!
এত খেয়েও মিনার্ভা বেড়ালই রয়ে গেল। সাইজ বেড়ালেরই। হাবভাব দেখে দার্শনিক-বিজ্ঞানীর দল যুক্তির তুবড়ি ছোটায়। বহুকাল আগে ওর পূর্বপুরুষ গহীন অরণ্যে রাজত্ব করত বুঝি, দুলকি চালে হামলে পড়ত শিকারের ঘাড়ে। বহুকাল ধরে পৃথিবীর রহস্যময়তায় সাইজ কমতে কমতে বেড়ালের রূপ নিয়েছে হয়তো বা।
কবিরা কাব্য করে। ধবল জোছনায় দেখে সে নিজেকেই, তবু সে পায় না খুঁজে নিজেরে আর।
একদিন মিনার্ভা কামড়ে ধরে মানুষেরই হাত-পিঠ-পেট, অতঃপর ঘাড়। তীক্ষ্ম দাঁতের তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে দিতে দিতে অগত্যা খুঁজে কি পায় নিজেকে? এই প্রশ্নের জবাবে উত্তর দেয়, মিঁয়াও!
দিব্যি শুনতে পাই হালুম গর্জন। তবে খুব নিচু স্বরে। যেন বা ভেসে আসে বহু দূর থেকে, যেখানে এক কালে গহীন অরণ্য ছিল বলে শুনেছিল আমাদের বাপদাদারা।
