প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিজয়ের যে আলোকবর্তিকা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, সেই মশাল নিয়েই আমরা আগামী দিনে চলতে চাই। বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে চাই। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে।’ গতকাল শুক্রবার বিকালে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা উদ্বোধনকালে তিনি এ প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
করাচির কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে দেশে ফিরেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন বিকালে তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ থেকে বঙ্গবন্ধু নামার পর পূর্ণতা পেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ৪৮ বছর আগে জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনার সূচনা হলো। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, তাদের পরিবারের সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য, ২ হাজারের বেশি আমন্ত্রিত অতিথি এবং ১০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত দর্শকের উপস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার বিকালে স্মরণ করা হয় সেই মুহূর্তকে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বক্তব্য দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন ও ক্ষণগণনার উদ্বোধন করেন ল্যাটপটের বোতাম চেপে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের ২৮টি স্পটে, ৫৩ জেলা ও দুটি উপজেলা মিলিয়ে মোট ৮৩টি জায়গায় বসানো কাউন্টডাউন ক্লকও সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়ে যায়। আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সূচনা হবে মুজিববর্ষের বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের; বছর জুড়ে চলবে সেই আয়োজন। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা আয়োজন থাকবে।
বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বক্তৃতায় আয়োজকদের ধন্যবাদ দিয়ে ১৯৭২ সালের সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহে ফিরে যান। তিনি বলেন, ‘সেই দিনটিতে আমরা হয়তো বিমানবন্দরে আসতে পারিনি, তখন আমার বাচ্চাটি ছোটো ছিল। কিন্তু আমার মনে পড়ে, মা সর্বক্ষণ একটি রেডিও নিয়ে বসে ছিলেন, ধারাবাহিক বিবরণ শুনছিলেন, আমরা পাশে বসে সারাক্ষণ ধারাবিবরণী শুনেছিলাম।’ জনগণের প্রতি তার বাবার গভীর ভালোবাসার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বলেন, ‘আমার মনে পড়ে, তিনি কিন্তু বাংলার মাটিতে নেমে আমাদের কথা ভাবেননি, পরিবারের কথা ভাবেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে তার প্রিয় জনগণের কাছে, তার প্রিয় মানুষগুলির কাছেই তিনি সর্বপ্রথম পৌঁছে যান। তারপর আমরা তাকে পাই। তিনি এদেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে।’ এই প্রেক্ষাপটে কবিগুরুর ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি’। তারই উত্তর (বঙ্গবন্ধু) দিয়েছিলেন এই ১০ই জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে। জাতির পিতা বলেছিলেন, কবিগুরু দেখে যান আপনার ৭ কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তারা যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে চলার প্রত্যয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাঝখানে একটা কালো অধ্যায় আমার জীবন থেকে চলে গেছে, সেই কালো অধ্যায় যেন আর কোনো দিন আমাদের দেশের মানুষের ওপর ছায়া ফেলতে না পারে।’ বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেন, ‘চলুন আজকের দিনে আমরা সেই প্রত্যয় নিই যে, এই বাংলাদেশ কারো কাছে মাথা নত করে না, বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে বিশ্বে চলবে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন সেই সোনার বাংলা ইনশাআল্লাহ আমরা গড়ে তুলব।’
গতকাল আমন্ত্রিত অতিথি ও নিবন্ধিতদের জন্য দুপুরের পর থেকেই উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় অনুষ্ঠানস্থলের নির্ধারিত প্রবেশ পথগুলো। সবাইকে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ বেলা ২টা থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে শুরু করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বিকাল সাড়ে ৪টা ২০ মিনিটে অনুষ্ঠানস্থলে এসে মঞ্চে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূল অনুষ্ঠানের শুরুতে পুরাতন বিমানবন্দরে অবতরণ করে সি-১৩০জে মডেলের একটি উড়োজাহাজ। আলোর অবয়বে নেমে এলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতীকী এই আয়োজনে এগিয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুকে বরণকারী নেতাকর্মীরা। পাকিস্তানের কারগার থেকে মুক্তি পাওয়ার দুই দিন পর লন্ডন হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি অপরাহ্নে বৃটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের এরকম একটি উড়োজাহাজে করেই তেজগাঁওয়ের বিমানবন্দরে পৌঁছান জাতির পিতা। গতকালও উড়োজাহাজটি ধীরে ধীরে এসে টারমাকে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে থামে। এ সময় বাজানো হয় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সেই গান- ‘বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়’। বিমানটি টারমাকে পৌঁছানোর পর দরজা খোলা হলে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পাতাকা হাতে ১৫০ জন তখন সেখানে লাল গালিচার পাশে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। তাদের জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান আর লেজার লাইটের মাধ্যমে বিমানের দরজায় ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে সেই আলোকবর্তিকা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে লাল গালিচার মাথায় ছোট্ট মঞ্চে এসে থেমে যায়। এরপর গার্ড অব অনার দেয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল। ১৯৭২ সালে যেভাবে এদেশের সংগ্রামী জনতা বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নিয়েছিল, প্রতীকীভাবে সেই ক্ষণটিও ফুটিয়ে তোলা হয়, ওড়ানো হয় এক হাজার লাল-সবুজ বেলুন এবং অবমুক্ত করা হয় একশ’টি সাদা পায়রা। ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার প্রতীকী অবতরণ দেখে কেঁদেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেঁদেছেন তার বোন শেখ রেহানাও। এ সময় সেখানে একটি আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।
এর আগে মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সদস্য সচিব কামাল নাসের প্রধানমন্ত্রীর হাতে মুজিববর্ষের লোগো তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী যখন ক্ষণগণনা ও লোগো উন্মোচন করেন তখন তাঁর পাশে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ রেহেনা ও দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলো সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী। এতে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক। এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীও অনুষ্ঠানে ছিলেন।
৭৭ মিশনে ২৬১ অনুষ্ঠান
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর পাশাপাশি দেশে সারা বছর যেসব অনুষ্ঠান হবে, তাতে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৭৭টি দূতাবাসে ২৬১টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত বছরজুড়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান সম্মতি জানিয়েছেন।
