ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারে নেমেছেন মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীরা। দুই সিটিতে ১৩ জন মেয়র এবং ৭৪৫ জন কাউন্সিলর রয়েছেন ভোটের লড়াইয়ে। ৭৫৮ জন প্রার্থীর মধ্যে আগামী ৩০ জানুয়ারি ভোটের আগেই দক্ষিণ সিটিতে ৪ জন কাউন্সিলর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম দিনে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল বেশি। প্রতীক পেয়েই রাজনৈতিক বক্তব্যে আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীরা প্রচারের মাঠ গরম করেছেন। আচরণবিধি মেনে চলার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে উত্তরের রিটার্নিং অফিসার আবুল কাসেম ও দক্ষিণের আবদুল বাতেন ইত্তেফাককে বলেন, আশা করি প্রার্থীরা বিধি মেনে প্রচারণা চালাবেন। কেউ বিধি ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভোটকে উত্সব পরিণত করতে প্রার্থী, রাজনৈতিকদল ও ভোটার-সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
দলীয়ভাবে শুধু মেয়র পদে নির্বাচন হলেও প্রধান দুই রাজনৈতিক দল নির্দলীয় কাউন্সিলর পদেও দলীয় মনোনয়ন দিয়ে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ‘ভাটা’ পড়া রাজনীতিতে ঢাকার ভোটে কিছুটা জোয়ার এসেছে। আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শুরু ৩২ ঘণ্টা আগে প্রচার কাজ বন্ধ করতে হবে। ভোটগ্রহণ শুরু হবে ৩০ জানুয়ারি সকাল ৮টায়। এক্ষেত্রে প্রচার বন্ধ করতে হবে ২৮ জানুয়ারি মধ্যরাত ১২টায়। তাই এবার প্রার্থীরা প্রচার কাজের জন্য ১৯ দিন সময় পাচ্ছেন।
প্রচারণা শুরুতেই বিএনপি দুই মেয়র প্রার্থী দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন হিসেবে নির্বাচনে উল্লেখ করে ভোটারদের কাছে ভোট চেয়েছেন। খালেদা জিয়া এবং ধানের শীষের পক্ষে স্লোগানে পল্টন এবং উত্তরা এলাকা মুখরিত করে তোলেন রাজপথের বিরোধীদল বিএনপি। অন্যদিকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে উত্তর সিটির আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. আতিকুল ইসলাম ভোটের প্রচারে এমপির অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়েছেন। অচল শহরকে সচল করতে নৌকা প্রতীকে ভোট চেয়েছেন। দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ডেমরা এলাকার পথসভার পর এলাকার অলিতে-গলিতে ঘরে ঘরে ঢুকে, দোকানে দোকানে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া ও নৌকার জন্য ভোট চান তিনি। নৌকার প্রার্থীর সমর্থকদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়ন সংগ্রহ, দাখিল, যাচাই-বাছাই এবং আপিলের পর শুক্রবার মেয়রসহ সব প্রার্থীর প্রতীক বরাদ্দ দেন দুই সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার। সকালে আগারগাঁওয়ে জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটে (এনআইএলজি) উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এবং গোপীবাগের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে দক্ষিণের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতীক বুঝে নেন মেয়র পদের প্রার্থীরা। মেয়র পদে দুই সিটির ১৩ প্রার্থীর সবাই ইসিতে নিবন্ধিত দলের মনোনীত হওয়ায় যার যার দলীয় প্রতীক নিয়েই তারা লড়বেন। আর কাউন্সিলর পদের প্রার্থীদের মধ্যে ইসিতে নির্ধারিত প্রতীকের তালিকা থেকে বরাদ্দ করছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
উত্তর সিটিতে প্রতীক পাওয়া ৬ মেয়র প্রার্থী হলেন-আওয়ামী লীগের মো. আতিকুল ইসলাম (নৌকা), বিএনপির তাবিথ আউয়াল (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (হাতপাখা), পিডিপির শাহীন খান (বাঘ), এনপিপির মো. আনিসুর রহমান দেওয়ান (আম) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আহম্মেদ সাজ্জাদুল হক (কাস্তে)। সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ৫৪টি পদে ২৫১ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের ১৮টি পদে ৭৭ জনের ইসির নির্ধারিত প্রতীক দেওয়া হয়।
দক্ষিণে মেয়র পদে সাত প্রার্থী হলেন-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নুর তাপস (নৌকা), বিএনপির ইশরাক হোসেন (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টি-জাপার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মো. আবদুর রহমান (হাতপাখা), এনপিপির বাহরানে সুলতান বাহার (আম), বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আকতার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লা (ডাব) ও গণফ্রন্টের আব্দুস সামাদ সুজন (মাছ)। দক্ষিণে সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ৭৫টি পদে ৩৩৫ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের ২৫টি পদে মোট ৮২ জনকেও প্রতীক দেওয়া হয়। অন্য প্রার্থীদের সুষ্ঠু ভোট নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে দেখা যায়।
আচরণ বিধিতে যা যা আছে :প্রার্থী বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ করতে পারবে, ঘরোয়া বৈঠক করতে পারবে। পথসভা করতে পারবে। কিন্তু বড়ো শোডাউন করতে পারবে না। রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে সভা করা, ব্যানার দিয়ে গেইট করা ব্যত্যয় বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটরা যারা থাকবেন তারা ব্যবস্থা নেবেন। নির্বাচনি ক্যাম্পে গান বাজানো কিংবা রাস্তা দখল করে সভা সমাবেশ করারও সুযোগ নেই আচরণ বিধিতে। ক্যাম্প থেকে হাই ভলিউম সাউন্ড দিয়ে কোনো নির্বাচনি গান, কিংবা নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। কোনো খাবার বিতরণ করা যাবে না। সেখান থেকে কেবল ভোটার স্লিপ প্রস্তুত করা, বা পোস্টার বিতরণ করা যাবে না। ভোটার তলিকা যাচাই করা বা এক ধরনের কাজ করা যাবে। মাইকিং করতে হবে কেবল দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে। পোস্টারটা অবশ্যই সাদা কালো করবেন। এর ব্যত্যয় করা যাবে না। নির্ধারিত মাপে করতে হবে। ২২ বাই ১৮ ইঞ্চি। পোস্টার দেওয়ালে সাটানো যাবে না। ঝুলিয়ে দিতে হবে। ব্যানারও রঙিন করা যাবে না। মন্ত্রী-এমপি বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রচারণা নিষিদ্ধ।
দক্ষিণে বিনা ভোটে নির্বাচিত ৪ কাউন্সিলর : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে ৪ কাউন্সিলর প্রার্থী। দুটি সাধারণ ওয়ার্ড ও দুটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে প্রত্যাহারের শেষ দিনে একক প্রার্থী হওয়ায় রিটার্নিং অফিসার আলাদা আলাদা বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন। দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের নির্বাচন কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত চার জনই আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী। তারা হলেন- ২৫ নম্বর সাধারণ ওয়ার্ডের মো. আনোয়ার ইকবাল এবং ৪৩ নম্বর সাধারণ ওয়ার্ডের মো. আরিফ হোসেন (বর্তমান কাউন্সিলর) ও সংরক্ষিত আসন ৬ নম্বরে (১৬, ১৭, ১৮ সাধারণ ওয়ার্ডের সমন্বয়ে) নারগীস মাহতাব (বর্তমান কাউন্সিলর) এবং সংরক্ষিত ৮ নম্বর আসনের (২২, ২৩, ২৬) নিলুফার রহমান।
উল্লেখ্য, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ভোটার আছেন ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ৬২১ জন; আর দক্ষিণে ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৮ জন। স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে ৩০ ডিসেম্বর ইভিএমে ভোট দেবেন তারা।
