উত্তরাঞ্চলে ৯ সরকারি চিনিকল
তরল বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে
নদ-নদী
মিলন রহমান, স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
উত্তরাঞ্চলে সরকারি ১০ চিনিকলের ৯টিতেই শিল্পবর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) না থাকায় চিনিকলের অপরিশোধিত তরল বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এই অঞ্চলের প্রধান ৯টি নদ-নদী। প্রায় ৭০ বছর ধরে এসব সরকারি চিনিকল নদী দূষণ করে আসলেও ইটিপি নির্মাণে অগ্রগতি নেই। এসব চিনিকল বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দূষণ ঠেকাতে ২০০৮ সালের ১৮ আগষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সব চিনিকলে ইটিপি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৯ সালে ১২ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী বর্জ্য পরিশোধনে প্রতিটি চিনিকলে ইটিপি স্থাপনের নির্দেশনা দেন। কিন্তু ১০ বছরেও নাটোর চিনিকল ছাড়া উত্তরাঞ্চলের অন্য কোনো চিনিকলে ইটিপি নির্মাণে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
বগুড়ায় অবস্থিত পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় থেকে জানা গেছে, নদী দূষণ ঠেকাতে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সরকারি চিনিকলে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে নাটোর চিনিকল ছাড়া অন্য সব চিনিকল ইটিপি নির্মাণে ব্যর্থ হয়। ২০১৩ সালের ৩১ জুলাই ৯টি চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়ে বগুড়ার পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ৯টি চিনিকলে এখন পর্যন্ত ইটিপি স্থাপন করতে পারেনি।
৫০ থেকে ৬০ দশকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৭টি চিনিকল স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে নয়টি স্থাপন করা হয় উত্তরাঞ্চলে। সেগুলো হলো—জয়পুরহাট, নাটোর, নর্থবেঙ্গল, রাজশাহী, রংপুর, রংপুরের শ্যামপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল। ১৯৯২ সালে স্থাপন করা হয় পাবনা চিনিকল।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, চিনিকলে ইটিপি না থাকায় দূষিত পানি, নির্গত ছাই, ছোবরা, গাদসহ তরল বর্জ্য বিভিন্ন নদ-নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে নদীর পানি দূষণের সঙ্গে নোংরা ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্যের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে হুমকির মুখে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান জানান, উত্তরাঞ্চলের ১০টি চিনিকলে মাড়াই মৌসুমে প্রতিদিন ২১ হাজার ৪০৫ ঘনমিটার তরল বর্জ্য নির্গত হয়। এসব বর্জ্যে পদ্মা, ছোটো যমুনা, করতোয়া, শোক, টাঙ্গন, বাঙ্গালী, তুলশীগঙ্গা, নারদ, আত্রাই এবং ইছামতিসহ উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদ-নদী ও সংলগ্ন খাল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় চিনিকলের তরল বর্জ্যে করতোয়া, সেতাবগঞ্জ চিনিকলের বর্জ্যে টাঙ্গন, ঠাকুরগাঁও চিনিকলের বর্জ্যে শোক ও টাঙ্গন, রংপুরের শ্যামপুর চিনিকলের বর্জ্যে করতোয়া, রংপুর চিনিকলের বর্জ্যে বাঙ্গালী নদী, রাজশাহী চিনিকলের বর্জ্যে পদ্মা, জয়পুরহাট চিনিকলের বর্জ্যে ছোটো যমুনা, তুলশীগঙ্গা ও আত্রাই, নাটোর চিনিকলের বর্জ্যে নারদ, নর্থবেঙ্গল চিনিকলের বর্জ্যে ইছামতি এবং পাবনা চিনিকলের বর্জ্যে পদ্মা নদী দূষিত হচ্ছে। তিনি আরো জানান, ইটিপি নির্মাণের জন্য দফায় দফায় চিনিকল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইটিপি চালু হচ্ছে না। এ অবস্থায় ইটিপি ছাড়াই চলতি মাসে অধিকাংশ চিনিকল মাড়াই মৌসুম শুরু হয়েছে। সর্বশেষ ইটিপি নির্মাণের অগ্রগতি জানতে চেয়ে পরিবেশ অধিপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় থেকে গত বছরের ৫ আগষ্ট জয়পুরহাট চিনিকলকে চিঠি দেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর চিঠির জবাবে জয়পুরহাট চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন আকন্দ পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চিনিকলে ইটিপি নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জয়পুরহাট চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের উদ্যোগে চিনিকলে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষের পথে।
পঞ্চগড় চিনিকলের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহানুর রেজা বলেন, ১৪টি চিনিকলে ইটিপি নির্মাণে বিএসএফআইসির একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পঞ্চগড় চিনিকলে ইটিপি স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যেই মাটি খোঁড়ার কাজ শেষ হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে ইটিপি চালু করা সম্ভব হবে না।
