জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিযায়ী পাখী

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪৩

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহুমুখী। একদিকে ইহার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িতেছে, সমুদ্রতীরবর্তী অনেক অঞ্চল ডুবিয়া যাইবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হইয়াছে; অপরদিকে ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলি হিমঝড় ও তীব্র তুষারপাতের মুখোমুখি হইতেছে আবার উচ্চ তাপমাত্রার কারণে গরমে হাঁসফাঁসও করিতেছে দক্ষিণ গোলার্ধ। দাবানল ছড়াইয়া পড়িয়াছে আমাজন ও অস্ট্রেলিয়ায়। ইহার সহিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুনিয়ায় কোটি কোটি বত্সর ধরিয়া বিচরণকারী হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণী অস্তিত্বসংকটে পড়িয়াছে। ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বত্সর প্রাচীন এই পৃথিবীতে প্রাণের উন্মেষ ঘটিয়াছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বত্সর পূর্বে। ইহার পরে পৃথিবী প্রাণিজগতে পাঁচ বার গণবিলুপ্তি দেখিয়াছে, যাহার সবগুলিই ছিল প্রাকৃতিক কারণে। এই গণবিলুপ্তিগুলির পরে পৃথিবী পুনরায় প্রাণে প্রাচুর্যময় হইয়া উঠিয়াছে; কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, বর্তমান দুনিয়া ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির মুখোমুখি এবং ইহা প্রাকৃতিক নহে, মানবসৃষ্ট। এবং প্রাণিজগতের এই গণবিলুপ্তির পর প্রকৃতি আর পূর্বের ন্যায় ক্ষতিপূরণ সাধন করিয়া স্বমহিমায় ফিরিয়া আসিতে পারিবে না। প্রকৃতির অংশ হিসাবে মানব প্রজাতিও এই বিলুপ্তির অংশ হইবে কি না তাহা সময়ই বলিয়া দিবে। তবে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসাবে মানুষের বিবর্তন যে অন্যান্য প্রাণীর জন্য ইতিবাচক হয় নাই তাহা বলাই বাহুল্য।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নানা চিহ্ন প্রকৃতিতে ছড়াইয়া ছিটাইয়া পড়িয়াছে। সূক্ষ্ম হইতে বড়ো নানা পরিবর্তন জলবায়ু বিপর্যয়কেই নির্দেশ করে। তেমনি একটি আপাত নিরীহ কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হইল—পরিযায়ী পাখিদের দীর্ঘদিনের গন্তব্য পালটাইয়া যাওয়া। ঘটনাটি বরিশালের। সেখানে শীত আসিলেই পরিযায়ী পাখিতে ভরিয়া যাইত দুর্গাসাগর দীঘি; কিন্তু এইবার পৌষ মাস শেষ হইতে চলিলেও পাখিশূন্য জেলার অন্যতম এই পর্যটন স্পট। একই অবস্থা বরিশালের সারসী দীঘি, তালতলী, পদ্মা দীঘি, দপদপিয়া, লাহারহাটসহ পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল বলিয়া পরিচিত এলাকাগুলির। শীতে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ বরফে ঢাকা পড়িয়া থাকে। তখন ঐ সকল দেশ হইতে বিভিন্ন পাখি নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর দেশে আশ্রয় নেয়। এই কারণে শীত মৌসুমে আমাদের দেশেও বিভিন্ন পরিযায়ী পাখি আসে। পাখি না আসায় পর্যটকদের পাশাপাশি মনঃক্ষুণ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও। জানা গিয়াছে, ১৯৯৬ সালে প্রায় ৪৬ একরের দুর্গাসাগর দীঘিকে ‘দুর্গাসাগর দীঘি উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য প্রকল্প’-এর আওতায় আনিয়া পর্যটন কেন্দ্র গড়িয়া তোলা হয়। বর্তমানে দীঘির তত্ত্বাবধানে রহিয়াছে বরিশাল জেলা প্রশাসন। এই দীঘির মধ্যে জঙ্গলপূর্ণ একটি দ্বীপ আছে। সাধারণত শীতকালে এ দ্বীপেই আশ্রয় লইত অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। 

বিশেষজ্ঞরা জানাইয়াছেন, এক দশক ধরিয়াই দুর্গাসাগরসহ বরিশালের আশপাশে অতিথি পাখির আগমন কমিয়া আসিয়াছে। ইহার প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন হইলেও পাশাপাশি রহিয়াছে পরিবেশদূষণ, শব্দদূষণ ও খাদ্যসংকট। বাংলাদেশের এক আঞ্চলিক শহরে অতিথি পাখি না আসিবার কারণটি কিন্তু বৈশ্বিক। ফলে ইহার সমাধানটিও আসিতে হইবে বৈশ্বিক পর্যায় হইতে। আমরা আশা করিব, জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃত্ব যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারিবে।