হাসান জাবির
আইআরজিসি বা ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড ক্রপস হচ্ছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আইআরজিসির গুরুত্বপূর্ণ দুই শাখা হচ্ছে ‘কুদস বিগ্রেড’ ও ‘এরোস্পেস ডিভিশন’। ইরানের ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি অপারেশন’-এর দায়িত্বে নিয়োজিত কুদস বিগ্রেড দেশটির সামরিক সক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ। প্রায় ২ লাখ সেনা নিয়ে গঠিত কুদস বিগ্রেডের নিয়ন্ত্রণেই আছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প। ১৯৯৭ সাল থেকেই এই চৌকস বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সম্প্রতি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন গুপ্তহামলায় নিহত বর্তমান বিশ্বের অত্যন্ত আলোচিত সামরিক ব্যক্তিত্ব লে. জেনারেল কাসেম সোলেইমানি। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল আমেরিকার বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল প্রতিরোধ ফ্রন্টের মধ্যমণি হিসেবে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী ও ইরানের অনুগত মিলিশিয়াদের সরাসরি পরামর্শ দিয়ে গেছেন তিনি। বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আসাদ বাহিনীর বিজয়ের অন্যতম রূপকার ছিলেন লে. জে. কাসেম সোলেইমানি। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের প্রধান সামরিক উপদেষ্টার ভূমিকায় নিয়োজিত এই ইরানি কমান্ডার নিজ দেশেও অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন।
সোলেইমানির দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারের কৃতিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাত্র কয়েক মাস আগে তাকে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি ইরাক সফরের শুরুতেই মার্কিন বিমান হামলায় তিনিসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় এক ডজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এর জেরেই ফুঁসে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণের নতুন ধারার অন্যতম প্রভাবক শক্তি ইরান। তারা প্রতিশোধ হিসাবে ইরাকে অবস্থিত দুইটি মার্কিন ঘাঁটি ‘আইন আল আসাদ ও ইরবিলে’ ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। ইরানি হামলার সত্যতা স্বীকার করে দেওয়া বিবৃতিতে পেন্টাগন ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। পরবর্তী সময়ে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে ট্র্যাম্পের বক্তব্য ও পরিমাণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। ইরানের ফার্স নিউজের মতে, এই হামলায় আমেরিকা ও তার মিত্র জোটের ৮০ সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আইন আল আসাদ ঘাঁটির রাডারব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল ইরানের কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়নি; কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের দাবি আক্রান্ত দুই ঘাঁটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে; কিন্তু মারা যায়নি কোনো মার্কিন সেনা। এমতাবস্থায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা নাগাদ আমেরিকার নিজ ভূখণ্ডে এক সঙ্গে প্রায় ৫২টি এফ-৩৫ বিমানের মহড়ার খবর দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে।
ইরান-মার্কিন ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের অতীত দেশ দুইটিকে বহুবার যুদ্ধের কিনারে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত আক্রমণ কিংবা পালটা আক্রমণের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি বিশ্ব; কিন্তু লে. জে. কাসেম সোলেইমানি হত্যা-উত্তর ইরানের আভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া খুবই মারাত্মক। কঠিন প্রতিশোধের মুহুর্মুহু স্লোগানে উত্তাল ইরানি জনগণ কাসেম সোলেইমানির হত্যাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা থেকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, আইআরজিসি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে লে. জে. সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ সংক্রান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। ১৩ ধাপের এই প্রতিশোধ পরিকল্পনার অংশ হামলাকে চপেটাঘাত বলে অভিহিত করেছেন দেশটির বিপ্লবী নেতৃত্ব। পরবর্তী ধাপগুলো আরো ভয়ংকর হবে বলেও অগ্রিম হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন তেহরান। প্রশ্ন হচ্ছে—ইরানের এই প্রতিশোধ স্পৃহা কতটা বাস্তবসম্মত?
আমরা সবাই জানি—পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সবার্থ এবং এ সংক্রান্ত সমীকরণের বাস্তবিক পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটছে গত দশক থেকেই। আঞ্চলিক শক্তিব্যবস্থার এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান অনুষঙ্গই হচ্ছে ইরান। অন্যদিকে আমেরিকা, ইসরায়েল ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের কৌশলে অগ্রাধিকার পায় ইরানকে কোণঠাসা করে রাখা। এই স্বাভাবিকতার একটি কার্যকর পরিবর্তন এনে দেয় আরব বসন্ত ও রাশিয়া। অর্থাত্ ইসলামি বিপ্লব-উত্তর ইতিহাসে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রুশ সামরিক হস্তক্ষেপ ইরানের জন্য বিরাট সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই ধারাবাহিকতায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার আঞ্চলিক সম্প্রসারণ প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি সমীকরণে ইসরায়েলের সক্ষমতার সংকোচন নিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই অনিবার্যতার বাস্তবিক প্রতিফলন দেখা যায় সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের মাত্র তিন দিন আগে। অর্থাত্ ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলরাশিতে দুই বিশ্বশক্তি রাশিয়া, চীনকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক ভিত্তিক নৌ-মহড়া সম্পন্ন করে ইরান। মূলত জলদস্যুতা মোকাবিলা, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মহড়ার লক্ষ্য বলে ঘোষণা করে তিন দেশ; কিন্তু মূল ব্যাপারটি হচ্ছে শক্তি প্রদর্শন। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের শক্তি দেখিয়ে পারস্য ও ওমান উপসাগরের পরিস্থিতি ঘোলাটে করার মার্কিন অপচেষ্টাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় ইরান। খুব পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে— রাশিয়া, ইরান, চীনের যৌথ নৌ-মহড়ার মধ্যদিয়ে আঞ্চলিক সমীকরণের সুস্পষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে। আর এই বাস্তবতা আড়াল করে নিজ ক্ষমতা শক্তি প্রদর্শন জরুরি মনে করেছে আমেরিকা। সম্ভবত এই পরিপ্রেক্ষিতেই ওয়াশিংটন, তেল আবিবের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ দিনের টার্গেট কাসেম সোলেইমানির বাগদাদ সফরকে বেছে নেন; কিন্তু আমেরিকা কি ইরানের পক্ষ থেকে আসা প্রতিক্রিয়াগুলোর কথা ভেবে দেখেনি?
আমেরিকা অবশ্যই ইরানের সক্ষমতার বিষয়গুলো খুব ভালো ভাবেই পর্যবেক্ষন করেছে। সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় দেশটির পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এই অর্জনের পথে পরাশক্তি রাশিয়ার একনিষ্ঠ সমর্থন, চীনের মতো শক্তিকে মিত্র হিসেবে পেয়েছে ইরান। অন্যদিকে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় নতুন নতুন সামরিক অস্ত্রসজ্জিত হয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। আছে রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তি। একই সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলেও এই মুহূর্তে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে ইরান। আমরা সবাই জানি, মাত্র কয়েক মাস আগেই কাসপিয়ান সাগরের সম্পদ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত উপকূলীয় ছয় দেশের মধ্যকার চুক্তি স্বাক্ষর একটি অন্যন্য ঘটনা। ঐ আলোকে কাসপিয়ান সাগরে বাইরের দেশের জাহাজ চলাচল একেবারে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে যে কোনো জরুরি অবস্থার মধ্যে মস্কো-তেহরান পরিবহন যোগাযোগ সরবরাহের ক্ষেত্রে কাসপিয়ান সাগরের এই সুবিধা ইরানের যুদ্ধকালীন দুর্বলতাকে অনেকভাবেই কাটিয়ে দিতে পারে। যা আমেরিকা ও তার মিত্রদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। যে কারণে বলা যায় যে— ইরানের প্রতিশোধের এই হুংকার ফাঁকা বুলি ছিল না। এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
n লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
