সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায় সংসদ সদস্যদের অংশ নেওয়ার পক্ষেই ছিল বর্তমান কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশন নির্বাচনী এলাকার বাইরের সংসদ সদস্যদের প্রচারের সুযোগ দিতে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব পুরোপুরি সমর্থন না করায় ঐ উদ্যোগে ভাটা পড়ে। এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, বাস্তবতার নিরিখে আমরা (২০০৯) সেই সময়ে এমপিদের প্রচারণার বাইরে রেখে আচরণ বিধিমালা করেছিলাম।
ইসি সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ১৩ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধনের দাবি জানায়। এরপর ঐ বছরের ১৯ এপ্রিল এ বিষয়ে বৈঠক করে কমিশন। বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। অপর একজন কমিশনার সব সংসদ সদস্যকে এ সুযোগ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের ঐ দাবির পক্ষেই কমিশনের সিদ্ধান্ত হয় এবং কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির সিইসি কবিতা খানমকে এ বিষয়ে সুপরিশ প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০১৮ সালের ২৪ মে কমিশন সভায় নির্বাচন কমিশন মাহবুব তালুকদার এ বিষয়ে তার নোট অব ডিসেন্টে উল্লেখ করেন, ‘আমি মনে করি সংসদের সদস্যদের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হবে। এতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির উদ্যোগ নস্যাত্ হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তড়িঘড়ি করে আইন ও বিধিমালা পরিবর্তন করে যেভাবে মাননীয় সংসদ সদস্যদের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অভিনব।’
কিন্তু মাহবুব তালুকদারের নোট অব ডিসেন্ট নির্বাচন কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন পায়নি। ঐ বছরের ২৪ মে নির্বাচন কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব এমপি দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন। কিন্তু এর চার দিন পর সিইসি কেএম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় এমপিরা এ সুযোগ পাবেন না। নির্বাচনী এলাকার বাইরের এমপিরা এ সুযোগ পাবেন। স্থানীয় এমপিদের এলাকায় প্রভাব থাকে। যার কারণে তাদেরকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারণার বাইরে রাখা হচ্ছে। তবে তারা ভোট দিতে পারবেন। তাছাড়া কেবল সিটি করপোরেশন নয়, স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন নির্বাচনী এলাকার বাইরের এমপিরা।
নির্বাচন কমিশন তাদের সংশোধনী প্রস্তাব ভোটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠালে মন্ত্রণালয় সাধারণভাবে সব এমপিকে প্রচারের সুযোগের পক্ষে মত দিলেও স্থানীয় এমপিদের নিষিদ্ধ রাখার বিষয়টিতে সম্মতি দেয়নি। এ অবস্থায় ইসিও পরে বিষয়টিতে আর আগ্রহ প্রকাশ করেনি।
২০০৯ সালে সর্বপ্রথম বিগত এটিএম শামসুল হুদা কমিশন স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণার বাইরে রাখতে আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের নির্বাচন দলীয়ভাবে করার আইন করা হলেও বিধিমালায় সংশোধন আনা হয়। বিগত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশনও এমপিদের প্রচারণার বাইরে রাখতে ২০১৬ সালে দলীয় আচরণ বিধি প্রণয়ন করে।
