ড. আর এম দেবনাথ
মাত্র কয়েক দিন আগে সমাপ্তি ঘটেছে ২০১৯ সালের। ঘটনাক্রমে বিগত সালের ছয় মাস পড়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে। এই অর্থে ২০১৯-২০ অর্থবছরের অর্ধেক সমাপ্ত হয়েছে। বাকি আছে আরো ছয় মাস। অর্থনৈতিক সমীক্ষা করতে হলে দুই ভাবেই করা যায়। তবে অবশ্যই তা হবে ‘ওভারলেপিং’। সে যাই হোক না কেন, মোদ্দা কথা হচ্ছে—কী আমাদের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি। শুরুতেই এক কথায় বলা যায়, অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো এখনো ইতিবাচক, যদিও আন্তর্জাতিক নানা চাপের মধ্যে রয়েছে আমাদের অর্থনীতিসহ বিশ্বের সব অর্থনীতি। এই সম্পর্কে ইত্তেফাকের একটি রিপোর্ট যথাযথভাবে অর্থনীতির অবস্থান তুলে ধরেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ‘চ্যালেঞ্জ থাকলেও স্বস্তির প্রত্যাশা অর্থনীতিতে’। এই খবর ছাড়াও বিগত কয়েক দিনের মধ্যে আরো কয়েকটি খবর ছাপা হয়েছে, যা থেকে অর্থনীতির মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়। যেমন একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে—‘কড়াকড়িতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ভাটা, জোয়ার সরকারের ব্যাংক ঋণে (৫.১২.১৯)। ডিসেম্বরের ১৯ তারিখের আরো খবরে বলা হয়েছে : ‘ভোক্তাদের জিম্মি করে সিন্ডিকেট লুটে নিল কয়েক হাজার কোটি টাকা’। এর আগের খবরটা মারাত্মক। ঐ খবরের শিরোনাম হচ্ছে : ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দুর্দিন। শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্র—স্বস্তি নেই কোথাও।’ ইত্তেফাকের এই চারটি খবরের বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কী তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। সঞ্চয়পত্রের ইস্যুটি ধরে আলোচনা করলে বোঝা যায় এর বেচাকেনা বলতে গেলে বন্ধ। নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এতে। সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে ‘এনআইডি’ লাগবে। ‘টিআইএন’ নম্বর লাগবে। অর্থের উত্স উল্লেখ করতে হবে। এগুলো হচ্ছে প্রকাশ্য কড়াকড়ি। রয়েছে অপ্রকাশ্য কড়াকড়ি। এখন থেকে কেউ সবমিলিয়ে ৫০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবে না। বর্তমানে এই সিলিং ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। তার মানে সিলিং কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। পাঁচ বছরি সঞ্চয়পত্র, তিন বছরি সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি যা-ই কেনা হোক না কেন, কেউ সবমিলিয়ে ৫০ লাখ টাকার বেশি কিনতে পারবে না। এই সম্পর্কে সরকারি কোনো প্রজ্ঞাপন নেই। অথচ ব্যাংক এসব নিয়ম চালু করেছে। এতে সাধারণ সঞ্চয়কারীরা বিপদে আছেই, সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে আয়কর দাতারা, যাদের প্রতিবছর সঞ্চয়পত্র কিনতে হয় আয়কর সাশ্রয়ের জন্য। সবচেয়ে মুশকিলের কথা অন্যত্র। সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নেওয়া কমিয়েছে; কিন্তু এখন ঋণ নিতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। বাণিজ্যিক ব্যাংক মানে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক সস্তায় সরকারকে ঋণ দেয় না। সরকার সস্তায় ঋণ নেয় সরকারি ব্যাংক থেকে। এতে আমানতকারীরা ঠকে। কারণ ব্যাংকের আয় কম হয়। তাই ব্যাংক আমানতকারীদের কম সুদ দিতে বাধ্য হয়। বড়ো কথা সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যবসায়ীদের ঋণে টান পড়েছে। এই অভিযোগ ব্যবসায়ীরা করে যাচ্ছে। সরকার পড়েছে দ্বিমুখী সমস্যায়। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নিলে মিডিয়া বলে সরকার উচ্চসুদে ঋণ নিচ্ছে। আবার সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তারা বলে সরকার ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছে না। কারণ সরকারের ঋণ অনেক বড়ো আকারের।
প্রকৃত সমস্যা অন্যত্র। দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্ট ‘সরকারের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি। এটি বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের জন্য বড়ো একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অবশ্য তার জন্য স্বস্তির খবর হচ্ছে রেমিট্যান্স। ২০১৯ সালে রেকর্ডপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। ধারণা করা হয়—এক ডলারে দুই টাকা সাবসিডি দেওয়ার ফলে ক্রেতারা বেশি বেশি ডলার দেশে পাঠাচ্ছে। কারণ যাই হোক না কেন, অর্থনীতিতে এর সুফল পড়ছে। গ্রামীণ জনসাধারণের আয় বেড়েছে। রেমিট্যান্স গ্রাহকরা বেশি বেশি ‘ক্যাশ’ পাচ্ছেন এবং ঐ ক্যাশ যাচ্ছে বাজারে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি উজ্জীবিত থাকছে। এ কথা ইত্তেফাকের রিপোর্ট আকারে ইঙ্গিতে বলা হয়েছে। একটা খারাপ খবর দিয়েছে ইত্তেফাক। এই খবরটি পেঁয়াজের দামসংক্রান্ত। পেঁয়াজ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে চলেছে। পেঁয়াজের কারবারিরা ফোকোটে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। এটা আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা হরেদরে করে খাচ্ছেন। বৃষ্টিবাদলে, পরিবহন সংকটে, সরবরাহ সংকটে, ঈদ-পূজাপার্বণ উপলক্ষ্যে যখন সুযোগ ঘটছে তখনই তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে বাজার থেকে টাকা লুটে নিচ্ছেন। নিচ্ছেন বাজেটের সময়ও। এই সমস্যার কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। অথচ এ কারণে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এটাও অর্থনীতির জন্য একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ এসব সংকটের পাশাপাশি এখন নতুন নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। চীন-আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ বিশ্বকে এক নতুন সংকটের মুখোমুখি করেছে। আমরাও এর শিকার হতে বাধ্য। কারণ আমাদের অর্থনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানির বাজার, রেমিট্যান্সের বাজার, বিদেশের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। এতদিন আমরা চলেছি ‘বাজার অর্থনীতির’ চিরায়ত নিয়মে। সারা বিশ্ব আমাদের বাজার। কোথাও কোনো বাধা নেই। নেই কোনো শুল্ক বাধা। সারা বিশ্ব এই নীতির অধীনে এগিয়ে চলেছিল; কিন্তু এর মধ্যে দুটো বাধা এসে গেল। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বাজার সীমিত করছে চীনের জন্য। চীন-মার্কিন বিশ্বের দুই বড়ো অর্থনীতি। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। চীন থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি মাল আমদানি করি। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম রপ্তানি বাজার। দুইয়ের মধ্যে ‘টানাটানি’ সম্পর্কে আমরা হচ্ছি ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য পড়েছে চ্যালেঞ্জের মধ্যে। রপ্তানি ইতিমধ্যে ২০১৯ সালে কমেছে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন—বাজার সম্প্রসারিত করতে। নতুন নতুন পণ্য রপ্তানির বাস্কেটে ঢোকাতে। এর আগে তিনি বলেছিলেন অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ানোর কথা। এই উভয়পথেই সমাধান নিহিত। আমাদের ব্যবসায়ীদের এই পথে এগোতে হবে। এখন সবশেষ সমস্যা যোগ হয়েছে আরো একটি। সেটা হচ্ছে ইরান-মার্কিন সমস্যা। এই সমস্যা হঠাত্ যোগ হয়েছে। যদি ইরান-মার্কিন সমস্যা দীর্ঘায়িত হয় তাহলে তেলের বাজার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বস্তুত স্থিতিশীল তেলের বাজার বিগত ১০ বছর যাবত্ আমাদের স্বস্তি দিয়ে আসছে। অর্থনীতি এর সুফল পাচ্ছে। যদি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে তাহলে আমাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। এসব সমস্যার বিপরীতে ভালো খবর হচ্ছে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের ২০১৯ সালে বেড়েছে। রপ্তানি চাপের মধ্যে থাকলেও এই খাতে আমাদের আয় এখন ৪০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ব ব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস-২০২০’ সূচকে আমরা আট ধাপ এগিয়েছি। এতে বিদেশি বিনিয়োগ উত্সাহিত হবে বলে ধারণা। অতীতের ‘পারফরম্যান্সের’ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। অতএব বর্তমান অবস্থান যেমন আমাদের ধরে রাখতে হবে, তেমনি অগ্রগতির ধারাও অব্যাহত রাখতে হবে। অর্থমন্ত্রীকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। তাতে অবিলম্বে ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি বাস্তবায়নের কাজ সমাপ্ত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার জন্ম হয়েছে। এর অবসান দরকার। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বার্থ দেখা দরকার। শেয়ারবাজার ঠিক করা দরকার। এখানে নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে হলে তাও করতে হবে। তার টিম, যা অর্থনৈতিক টিম বলে পরিচিত তা ঠিকঠাক করা দরকার বলে মনে করি। আশা করি এসব ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী তার দক্ষতার স্বাক্ষর রাখবেন।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
