অর্থ আর ক্ষমতায় বদলে যায় সাক্ষ্য

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ২২:২৪

গৃহকর্মী নির্যাতন সমাজে হরহামেশাই ঘটছে। এর মধ্যে দুু-একটি ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ালেও অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতিতা তার জবানি বদলে ফেলেছেন। পরিবারও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়নি। কেন নির্যাতিতা বা তার পরিবারের সাক্ষ্য বদলে যাচ্ছে? ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অর্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাবের কাছে হার মেনেছে নিম্নবিত্ত গৃহকর্মী ও তার পরিবার। অর্থের প্রলোভন বা উচ্চবিত্তদের চোখ রাঙানি তারা উপেক্ষা করতে পারেনি। একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই নীরবে অশ্রু ফেলে বাড়ি ফিরেছে।

নড়াইলের লোহাগড়ার তাহিরপাড়া গ্রামের রাসেল শেখের মেয়ে রোকসানা খানম (১০)। সে তাহিরপাড়া সরকারি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। প্রতিবেশী সালেহা বেগমের প্রলোভনে মেয়েকে ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকায় আসাদুল্লাহ মোল্লার বাড়িতে পাঠান। দুই মাস পর রাসেল শেখ ঢাকায় এসে দেখেন তার মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজ করাচ্ছে। মেয়েকে বাড়িতে ফেরত নিতে চাইলেও আসাদুল্লাহ দেননি। ১৬ আগস্ট আসাদুল্লাহর স্ত্রী সোনিয়া বেগম টেলিফোন করে রাসেল শেখের স্ত্রীকে জানান, তার মেয়ে খুবই অসুস্থ। সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি। দ্রুত তিনি ঢাকায় এলে আসাদুল্লাহ মেয়েকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেন। মেয়েকে লোহাগড়া নিয়ে যান রাসেল। সেখানে হাসপাতালের চিকিত্করা জানান, মেয়েটির সারা শরীরে এমনকি গোপনাঙ্গেও গরম খুনতির ছ্যাঁকা। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে নড়াইল সদর হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা করানো হয়। বিষয়টি জানতে পেরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র মেয়েটির পাশে দাঁড়ায়। নড়াইলে মামলা হয় আসাদুল্লাহ ও তার স্ত্রী সোনিয়া বেগমের বিরুদ্ধে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র উপপরিচালক নীনা গোস্বামী ইত্তেফাককে বলেন, মেয়েটির পরিবারকে আমরা আইনি সহায়তা দিচ্ছিলাম। মেয়েটির ওপর কী বীভত্স নির্যাতন করা হয়েছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। মামলাটি নড়াইলের নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে ওঠে। বিচারও শুরু হয়। অভিযুক্তদের শাস্তি যখন প্রায় নিশ্চিত তখনই মেয়েটি আদালতকে জানায়, আসাদুল্লাহ বা তার স্ত্রী    তার ওপর কোনো নির্যাতন করেনি। কাজ করতে গিয়েই আগুনের ছ্যাঁকা লেগেছে। রাসেল শেখ ও তার স্ত্রীও অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। ফলে গত বছরের ৩০ এপ্রিল বিচারক অভিযুক্তদের খালাস দিয়ে দেন। কেন তারা অভিযোগ প্রত্যাহার করল? জবাবে নীনা গোস্বামী বলেন, আমাদের কিছু বলেনি। হয়তো উচ্চবিত্তদের অর্থের কাছে তারা হেরে গেছে।

তবে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে রাসেল শেখের প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, মাত্র ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তারা অভিযোগ থেকে সরে আসেন। এ বিষয়ে প্রতিবেশীরা কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের শিশু শ্রম বন্ধের জন্য গঠিত কমিটির কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সামলা আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা একটা কেসও কিন্তু এখন পর্যন্ত জাজমেন্ট সেরকম দেখিনি যে গৃহকর্মীকে মারার কারণে শাস্তি হয়েছে। যে দিনের মধ্যে ইনভেস্টিগেশন শেষ হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে না। গৃহকর্মীরা সবাই হতদরিদ্র কিন্তু দোষীরা সবাই প্রভাবশালী, এখানে তদন্ত সময় মতো হয় না, সেখানে করাপশন থেকে শুরু করে অনেক বিষয় আছে। আর কেস যখন চলতে থাকে একটা পর্যায়ে গিয়ে বাবা-মায়েরা আপস করে ফেলে, টাকা-পয়সা নিয়ে মিটমাট করে ফেলে।’

সালমা আলী আরো বলেন, ‘আমরা নিজেরাই ভিকটিমকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করেছি। আসামিও গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যেই তারা ভিকটিমের পরিবারকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলে। আর একটা বিষয় আমরা দেখেছি, গৃহকর্মীকে অধিকাংশ সময় আনা হয় গ্রাম থেকে। আর অভিযুক্ত যদি ঐ গ্রামের হন তাহলে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে চাপ দিয়ে মিটমাট করতে বাধ্য করে।’ 

২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় ক্রিকেট দলের পেস বোলার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহানের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ঐ দিন সন্ধ্যায় ঢাকার মিরপুর থেকে শিশু গৃহকর্মীকে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় উদ্ধার করেন খন্দকার মোজাম্মেল হোসেন নামে একজন সাংবাদিক। ঐ শিশু গৃহকর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানায় গৃহকর্মীর শরীরে প্রচুর নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আলী আজগর স্বপন তখন জানিয়েছিলেন, গৃহকর্মীর শরীরে নির্যাতনের অনেক চিহ্ন থাকার সাক্ষ্যপ্রমাণ চিকিত্সকরাও দিয়েছেন। শাহাদাত ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গত ৬ সেপ্টেম্বর শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা হয়।

ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন এই দম্পতি। এরপর ৪ অক্টোবর শাহাদাতের স্ত্রীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিনই শাহাদাত আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তদন্ত শেষে ২৯ ডিসেম্বর পুলিশ এই দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। ডিসেম্বর মাসেই জামিনে মুক্তি পান শাহাদাত দম্পতি। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ঢাকার ৫ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়। সাত জন আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষীও দেন। এরপর নির্যাতিত গৃহকর্মী আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে বলেন, তার শরীরে যে আঘাতের চিহ্ন তা পড়ে গিয়েই পেয়েছেন। তাকে কেউ নির্যাতন করেনি। ঐ দিনই বিচারক তানজিনা ইসমাঈল অভিযুক্ত শাহাদাত ও তার স্ত্রীকে বেকসুর খালাস দেন। এই ঘটনায়ও অর্থের বিনিময়ে সাক্ষ্য বদলে গেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। পাশাপাশি শাহাদাতের প্রভাবও ছিল ভিকটিম ও তার পরিবারের ওপর।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই নিম্নবিত্ত মানুষগুলো আদালতে দৌড়াতে দৌড়াতে বিরক্ত হয়ে যান। এমনিতেই মেয়ের ওপর নির্যাতন, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার ওপর আদালতে ছোটাছুটি। সব মিলিয়ে তারা মনে করে, মেয়ে তো গেছেই এখন কিছু টাকা পেলে হয়ত তাদের সংসারে একটু হলেও সচ্ছলতা ফিরবে। ফলে টাকার কাছে তারা হেরে যান। আবার অনেক সময় এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হুমকিতেও তারা পিছু হটেন।’

২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’ মন্ত্রিসভায় পাশ হয়। ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি একটি গেজেটে এই নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। ঐ নীতিমালা অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কাউকে গৃহকর্মী রাখা যাবে না। তবে ১২ বছর বয়সের কাউকে গৃহকর্মী রাখতে হলে তার আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষের উপস্থিতিতে নিয়োগকারীকে আলোচনা করতে হবে। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে এই আলোচনা, চুক্তি, সমঝোতা বা ঐকমত্যের সময় নিয়োগের ধরন, তারিখ, মজুরি, বিশ্রামের সময় ও ছুটি, কাজের ধরন, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং গৃহকর্মীর বাধ্যবাধকতা—এসব বিষয়ের উল্লেখ রাখতে বলা হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, তাদের কাজের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে। তাদের তথ্য সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অসুস্থ অবস্থায় কোনো গৃহকর্মীকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। নিয়োগকারীকেই নিজের অর্থে গৃহকর্মীর চিকিত্সা করাতে হবে। এছাড়া গৃহকর্মীকে তার নিজের ধর্ম পালনের সুযোগ দিতে হবে। কর্মরত অবস্থায় কোনো গৃহকর্মী দুর্ঘটনার শিকার হলে চিকিত্সাসহ দুর্ঘটনা ও ক্ষতির ধরন অনুযায়ী নিয়োগকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গৃহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, দৈহিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। গৃহকর্মীর ওপর কোনো ধরনের হয়রানি ও নির্যাতন হলে বিচারের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক সাদেকা হালিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘গৃহকর্মীদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন হয় সেটা বর্ণনা করা কঠিন। এদের অধিকাংশই আসেন গ্রাম থেকে। এদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। জাতিসংঘের শ্রম সংস্থা আইএলও এদের সুরক্ষার জন্য অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে। এরা এমন একটা শ্রেণি যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, অরক্ষিত। গার্মেন্ট শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আছে, অন্য সবার বিচার চাওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু গৃহকর্মীদের এমন কোনো সুযোগ নেই। গৃহকর্তা বা কর্ত্রী ইচ্ছেমতো নির্যাতন করছে, ধর্ষিত হচ্ছে, ঠিকমতো বেতন দিচ্ছে না—এসব নিয়ে তারা কার কাছে যাবে? ফলে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার দাবি এখন সব মহল থেকেই উঠতে হবে।’