মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, সিনিয়র শিক্ষক
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা
একাত্তরের দিনগুলি
১.
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মতো চিত্কার করতে করতে,
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র।
ক.জেনারেল নিয়াজী কতজন সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন?
খ.কারফিউ উপেক্ষা করে দলে দলে লোক রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল কেন?
গ.উদ্দীপক ও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনাটি কোন দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখা কর।
ঘ.উদ্দীপকটি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনার পূর্ণভাব ধারণ করে না মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।
ক.জেনারেল নিয়াজী নব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
খ.পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের কথা শুনে কারফিউ উপেক্ষা করে দলে দলে লোক রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সারা ঢাকা শহরে চাঞ্চল্য ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল। কেননা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। এই সংবাদ শুনে সমস্ত মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত করে কারফিউর মধ্যেই দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে।
গ.স্বাধীনতা যুদ্ধের নির্মম অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরার দিক থেকে উদ্দীপক ও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনার সাদৃশ্য বিদ্যমান।
প্রত্যেক মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে মানুষ নানা চেষ্টা ও সংগ্রামে লিপ্ত হয়। আর এজন্য প্রচুর ত্যাগ-স্বীকার করতে হয়। আবার কখনো কখনো সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। তেমনিভাবে ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বাংলার মানুষ। রক্তাক্ত এ যুদ্ধের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা হয় স্বাধীনতার সূর্যকে। যার চিত্র ফুটে উঠেছে উদ্দীপক ও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনায়।
উদ্দীপকে কবি স্বাধীনতা লাভের জন্য যেসব বিষয়ের কথা তুলে ধরেছেন তা বাস্তবজীবনেও ঘটেছে। স্বাধীনতার স্বপ্নে মানুষ ত্যাগ স্বীকার করেছে। দানবীয় কণ্ঠে চিত্কার করে শহরের বুকে জলপাইরঙের ট্যাঙ্ক এলো। চারিদিকে উজাড় হয়ে গেল সব ছাত্রাবাস ও বস্তি। অত্যাচারীদের রাইফেল আর মেশিনগানের গুলির খই ফোটার মতো আওয়াজ ধ্বনিত হলো। আবার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় প্রথমেই ঢাকার নগর-জীবন বিশৃঙ্খলা হয়ে পড়েছিল জোর করে স্কুল-কলেজ খোলা, বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে জোর করে রেডিও-টিভিতে বিবৃতি প্রদান করা, হত্যা-লুণ্ঠন-অগ্নি সংযোগ এই ছিল সেই দুঃসময়ে দেশের অবস্থা। তাই বলা যায়, নির্মম অত্যাচারের প্রতিচ্ছবি অঙ্কনের দিক থেকে উদ্দীপক এবং একাত্তরের দিনগুলির রচনাটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
ঘ. ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনার বহুমুখী ভাবের মধ্যে উদ্দীপকে শুধু পাকিস্তানিদের অত্যাচারের চিত্রটি উদ্ভাসিত হওয়ায় উদ্দীপকটি আলোচ্য রচনার সমগ্র ভাবকে ধারণ করে না। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভীষিকাময় চিত্র ধারণ করা হয়েছে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনায়। যার প্রতিফলন ঘটেছে উদ্দীপকেও। তবে উদ্দীপকে শুধু অত্যাচারীদের অত্যাচারের ইঙ্গিত থাকলেও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনায় আরও অনেক দিক রয়েছে যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। উদ্দীপকে কবি স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য বাঙালি জাতির ত্যাগ-তিতিক্ষার বর্ণনা দিয়েছেন। অত্যাচারী পাক বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের চিত্র কবি ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করতে শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক দানবীয় কণ্ঠে চিত্কার করতে করতে আসে। চারিদিকে বিরান পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায় পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞে। প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনায়ও লেখিকা পাকিস্তানিদের নির্মম অতাচারের চিত্র তুলে ধরেছেন এবং মানুষের দুর্বিষহ জীবনযাপনের চিত্র অঙ্কন করেছেন। পাকবাহিনীর অত্যাচারের চিত্র ছাড়াও তুলে ধরেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্বাধীন বাংলা বেতারে বাঙালিদের অবস্থান, লেখিকার পারিবারিক চিত্র প্রভৃতি যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই উদ্দীপকটি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনার আংশিক ভাব ধারণ করে, পূর্ণভাব নয়। পরিশেষে উদ্দীপক ও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনা বিচার ও বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, উদ্দীপকটি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনার পূর্ণভাব ধারণ করে না। কেননা, পাকবাহিনীর অত্যাচারের দিকটির মিল থাকলেও রচনাটির অন্যান্য অনেক দিক উদ্দীপকে অনুপস্থিত রয়েছে।
