বিমান দুর্ঘটনা থেকে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১০

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধের দামামা বাজছে। বিশ্লেষকরা দাবি করছে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থেকে সরে আসবে দুই পক্ষই। কিন্তু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলছেই। সেই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাশুল দিতে হলো ১৭৬ জন নিরীহ বেসামরিক বিমান আরোহীকে। কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি আল-আসাদ ও ইরবিলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর পরপরই ইরানের আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেহরান থেকে কিয়েভগামী ইউক্রেন এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৩৭ বিমান ভূপাতিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় ইরানের ৮২, কানাডার ৬৩ জনসহ ১৭৬ জন আরোহী যার মধ্যে ১৫ জন শিশু। ইরানের পক্ষ থেকে শুরুতে হামলার কথা অস্বীকার করা হলেও পরবর্তীকালে ‘মানবীয় ভুলে’ বিমান দুর্ঘটনা বলে দাবি করে এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এই ঘটনার ফলে সোলেইমানিকে হত্যার পর বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের প্রতি যে নমনীয় মনোভাব তৈরি হয়েছিল তা পালটে গেছে। বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড়ের পাশাপাশি নিজ দেশে বিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান সরকার।

এদিকে কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করার পর ইরানের পক্ষ থেকে ছয় জাতির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু শান্তি চুক্তি থেকে বের হয়ে আসার কথা বলা হয়। যে চুক্তি থেকে আমেরিকা ২০১৮ সালেই সরে গেছে।

অন্যদিকে জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়া চেষ্টা করছে একটি নতুন শান্তিপূর্ণ সমাধানের। বিশেষজ্ঞের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে গেলে ইরানের পক্ষে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব। কিন্তু ইরানের এই অস্ত্রের মজুত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র গেলে ইরানের শত্রু দেশ সৌদি আরব এই অস্ত্র অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠবে। অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের উদীয়মান সামরিক শক্তি তুরস্ক ক্রমশ মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করবে। সামরিক উচ্চাভিলাষী এই দেশও তখন পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নামবে। এদিকে ইরানকে ঘিরে থাকা ১০টি মুসলিম বিশ্বে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে মার্কিন ৬৫ হাজার সেনা অবস্থান করছে। এসব সামরিক স্থাপনা ও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধভাবাপন্ন অঞ্চলে পরিণত করবে।

এই ধরনের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মধ্যে ইরানসমর্থিত লেবাননে হিজবুল্লাহও কাসেম সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়ায় থাকা ইরানি সমর্থিত বাহিনীর এই ঘটনায় ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভ মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। এদিকে সোলেইমানি হত্যার দুই দিন পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে বার্তাবাহক হিসেবে ইরাকের আমন্ত্রণে বাগদাদ এসেছিলেন সোলেইমানি। এই তথ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের অজানা থাকার কথা নয়। এদিকে হামলার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জার্মানি ও তুরস্ক সফর করেছেন। অন্যদিকে কাতার ও ওমান সমঝোতার চেষ্টা করছে বলে খবর বের হয়েছে। এদিকে ১২ জানুয়ারি কাতারের আমির তেহরান পৌঁছেছে। সমসাময়িক সময়ে শান্তির বার্তা নিয়ে ইরান পৌঁছেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও।

এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে পাক সেনাপ্রধান তার দেশ কোনো পক্ষ না নেওয়া ও তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে নিজ ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। সেই সঙ্গে পাক প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ইরান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব সফর ইরান, সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলতে থাকলে ইউক্রেনের বিমান দুর্ঘটনার মতো আরো বেসামরিক দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে উত্তম হবে মধ্যপ্রাচ্যে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য গঠনে সব পক্ষের ঐকমত্য। গুপ্তহত্যা ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে হবে পেন্টাগনকে। ইউক্রেনের বিমান দুর্ঘটনায় নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ইরানকে। অন্যদিকে তেহরানের উচিত হবে পারমাণবিক শান্তি চুক্তি মেনে চলা, ঠিক তেমনি আমেরিকার উচিত হবে সমস্ত সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে ইরানের ওপর চলমান অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে দেওয়া।

ইরাক ও সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি সব দেশের সম্মান প্রদর্শন করে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্রের ঝনঝনানি থেকে সব পক্ষকে সরে আসতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার দাবানলের পর যেমন পোড়া গাছে নতুন মুকুল ফুটেছে ঠিক তেমনি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ফুটুক জীবনের মুকুল। বন্ধ হোক ইসরাইল-মার্কিন দখলদারিত্ব আর সৌদি-ইরান সামরিক উত্তেজনা।

n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়