প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। এতে করে সময় ও অর্থের অপচয় ছাড়াও প্রকল্পের কাজের মানে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদন পর্যায় থেকে শুরু করে এর বাস্তবায়নকাল পর্যন্ত নানা জটিলতা রয়েছে। এসব জটিলতা নিরসন না করে যত বড়ো অঙ্কের বাজেট বরাদ্দই দেওয়া হোক না কেন, এর সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বর্তমানে আমাদের বাজেটের আকার ৪ লাখ কোটি টাকার। এর মধ্যে উন্নয়ন বরাদ্দই ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। প্রতি বছরই উন্নয়নে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ছে, বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। বরং প্রতি বছরই বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের ফারাক বাড়ছে। এডিপি সংশোধন করেও শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছর এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ শতাংশের নিচে।
চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাত্ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কমেছে। চলতি অর্থবছরের এই সময়ে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ২৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ২৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আইএমইডির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, এডিপিতে গত ছয় মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খরচ করতে পেরেছে ৫৬ হাজার ৭১২ কোটি ১২ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের ছয় মাসে খরচ হয়েছিল ৪৯ হাজার ৬৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সে হিসাবে টাকার অঙ্কে বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু শতাংশের হিসাবে বাস্তবায়ন কমে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমে গেলে সামগ্রিক বাজেট বাস্তবায়নও কমে যায়। এর কারণ শুধু ব্যয়ের সক্ষমতা নয়, উন্নয়নকাজে প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতাও এর বড়ো কারণ।
উদাহরণস্বরূপ একটি রাস্তার কথাই বলা যাক। একটি নতুন রাস্তা তৈরি করতে হলে সেটি যদি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়, তবে ঐ সংস্থার প্রধান প্রকৌশলীকে লিখতে হবে। সাধারণত, স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ চিঠি লিখে চাহিদা জানান প্রধান প্রকৌশলীর কাছে। চিঠি পাওয়ার পর তিনি জেলা বা উপজেলায় পাঠিয়ে দেন। সেখানে উপজেলা প্রকৌশলী একটি প্রাক্কলন তৈরি করেন। সেটি আবার প্রধান প্রকৌশলীর অফিস পর্যন্ত আসে। এর মধ্যে যদি চলমান প্রকল্প হয় এবং তহবিল থাকে, তাহলে পুনরায় উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। নতুন প্রকল্প হলে প্রধান প্রকৌশলীর অফিসে এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এরপর প্রধান প্রকৌশলী সম্মতি দিলে সেটি প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। প্রশাসনিক অনুমোদন নিতেও তিন থেকে পাঁচ মাস সময় লেগে যায়। তারপর প্রকল্প পরিচালকের মাধ্যমে তা পরবর্তী ধাপে যাবে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে। টেন্ডারে কমপক্ষে ২৮ দিন সময় লাগে। তারপর কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। এখানেও ঝামেলা আছে। উপজেলা পর্যায়ে কাজের জন্য ঠিকাদারের যে যোগ্যতা থাকা লাগে, তা সবার থাকে না। ফলে তারা ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের বড়ো ঠিকাদারদের শরণাপন্ন হয়। কিংবা বড়ো ঠিকাদারেরা কাজ পেয়ে তা সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়ে দেয়। ঠিকাদারদের আবার পারফরম্যান্স সিকিউিরিটি জমা দিয়ে প্রায় ২০-২৫ দিন লাগে। কখনো বা রিটেন্ডারেও যেতে হয়।
এদিকে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যেসব শর্ত থাকে, সেগুলোও সময়মতো কাজ বাস্তবায়নে সহায়ক নয়। কয়েক বছর মেয়াদি প্রকল্প হলে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানও থাকে না। কয়েক কিস্তিতে টাকা দেওয়া হলে তা কাজের ধরন পালটায় এবং সময় বাড়িয়ে দেয়।
সর্বোপরি, একটি প্রকল্প অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন পর্যায়ে মনিটরিং করার জন্য অনেক কর্মকর্তাই থাকেন। কিন্তু সঠিকভাবে, সঠিক সময়ে হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ অনেক ধাপ রয়েছে। সবার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে কাজ যেমন ভালো হয়, তেমনি কাজ না করে টাকা নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসত না। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, বাজেট বরাদ্দ কমবেশি হওয়া বড়ো কথা নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটা আমূলে বদলানো উচিত। তাহলে সময় কম লাগার পাশাপাশি কাজের মানও ভালো হবে। বিভিন্ন দপ্তরে বড়ো বড়ো রাঘববোয়ালের ‘মস্তানি’ বন্ধ হবে।
