টয়লেটের ফলস রুমে দীর্ঘ আড়াই মাস আত্মগোপনে ছিলেন ক্যাসিনো কারবারি ও আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রূপন ভূঁইয়া। এক নাপিতের পথ অনুসরণ করে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এনামুল-রূপন দুই ভাই ঘরের মধ্যেই চুল-দাড়ি কাটতেন। অভিযান শুরুর আগে তারা গ্রেফতার আতঙ্কে কক্সবাজার যান। সেখান থেকে সাগর পথে মিয়ানমার হয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। পরে সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে কেরানীগঞ্জে একটি বাড়িতে আত্মগোপন করেন। গতকাল ভোরে তাদের শুভেঢ্যার শ্যামল ছায়া কমপ্লেক্স নামে ১০তলা ভবনের পঞ্চম তলার ভবন থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গতকাল দুপুরে মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে সংস্থাটির ডিআইজি (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন দুই ভাই। রাতে ঘুমাতেন টয়লেটের ফলস রুমে। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর এক নাপিতের পথ অনুসরণ করে ঐ ফ্ল্যাটে যাওয়া হয়। সেখানে ফলস রুম থেকে নামিয়ে তাদের নিয়ে আসেন গোয়েন্দারা। বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন তাদের বিশ্বস্ত কর্মচারী শেখ সানি মোস্তফা। তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
জানা গেছে, গোয়েন্দারা প্রথমে তার কর্মচারী সানিকে অনুসরণ করা শুরু করে। পরে ঐ কর্মচারীর বাসায় নজরদারি বাড়াতে সোর্স নিয়োগ করা হয়। কিছুদিন পর বাইরে থেকে নাপিতের আসা-যাওয়া চোখে পড়ে। এরপর ঐ নাপিতের পথ ধরেই দুই ভাইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা, ১২টি মোবাইল ফোন, বাড়ির দলিলপত্র এবং ব্যাংকের কাগজপত্র উদ্ধার করে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১৮ সেপ্টেম্বর এনামুলের শেয়ার থাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাবের ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র্যাব। ২৫ সেপ্টেম্বর গেন্ডারিয়ায় এনামুল-রূপন ও তাদের দুই সহযোগীর বাসা থেকে ৫ কোটির বেশি টাকা, আট কেজি স্বর্ণ (৭০০ ভরি) ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে র্যাব। এ ঘটনায় গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর ও ওয়ারী থানায় সাতটি মামলা হয়। পরবর্তীতে দুদক তদন্ত করে ২৩ অক্টোবর ৩৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এনামুল ও রূপনের বিরুদ্ধে দুইটি মামলা করে। অভিযানের আগেই তারা গা ঢাকা দেন।
সিআইডির শীর্ষ কর্মকর্তা ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে দুই ভাইয়ের সম্পত্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। এই দুই জনের মোট ২২টি জমি ও বাড়ি রয়েছে, যার অধিকাংশই পুরান ঢাকা এলাকায়। এছাড়া সারাদেশে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ৯১টি অ্যাকাউন্টে তাদের মোট ১৯ কোটি টাকা জমা রয়েছে; যা ফ্রিজ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত পাঁচটি গাড়িও রয়েছে দুই ভাইয়ের। সেপ্টেম্বরে দুই জনের বাড়িতে অভিযানের সময় ৫ কোটি টাকা উদ্ধার হয়। দেশের বাইরে পাচার করতে তারা সেগুলো রেখেছিলেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল, নৌযানে অবৈধভাবে মিয়ানমার হয়ে মালয়েশিয়া পালিয়ে যাবেন। যার কারণে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তারা। তবে ঐ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে প্রতিবেশী দেশ হয়ে নেপালে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। এজন্য তারা ঢাকায় এসে ঐ বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখান থেকে বেনামি পাসপোর্ট তৈরির পরিকল্পনা করছিলেন দুই ভাই। এ কাজেই ব্যয়ের জন্য ৪০ লাখ টাকা সঙ্গে রেখেছিলেন তারা। সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ আরো বলেন, আমরা জেনেছি এই দুই জনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ক্যাসিনো কারবারের গোড়াপত্তন হয়। নেপালিদের মাধ্যমে তারা ক্যাসিনোর সরঞ্জাম বাংলাদেশে এনেছে। এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক ছিলেন। তাদের সবচেয়ে বেশি হিসাব খোলা হয় ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও স্ট্যান্ডান্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। বড়ো অঙ্কের অর্থ জমা রাখার কারণে ব্যাংকগুলো এনামুল-রূপনকে বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা দিতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। ব্যাংকের কাছে এনামুল-রূপন ভিআইপি গ্রাহক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
