তথ্যপ্রযুক্তি খাত :সেই দশক এই দশকের প্রবৃদ্ধির চালচিত্র

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ২১:২৬

মোজাহেদুল ইসলাম

 

এক দশকের বেশি সময় ধরে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হচ্ছে । সাম্প্রতিক সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানিতে বেশ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দেশে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে রপ্তানি আইসিটি ডিভিশনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যা টাকার হিসেবে প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। 

এলআইসিটির তথ্যমতে, দেশের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যারের বাজারও বড় হচ্ছে। দেশের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই আবার দেশি সফটওয়্যার নির্মাতারা দখল করেছেন। দেশের ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৭টি ব্যাংকেই দেশি সফটওয়্যার ব্যবহূত হচ্ছে। দেশের সফটওয়্যার খাতে বেশি চাহিদা রয়েছে ইআরপি, বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন তৈরিসহ, ডিজিটালাইজেশনের কাজে ব্যবহূত সফটওয়্যার।

সরকারের জিআরপি সিস্টেমসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পেও কাজ শুরু করেছে দেশের সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো। এ কাজ পায় সিনেসিস আইটি যা পরে কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, দেশের বাজারে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এখন আমাদের সফটওয়্যার নির্মাতারা বিদেশেও রপ্তানি করছে। দেশের এক দশকের অর্জনে আমরা গর্বিত। আমাদের লক্ষ্য আরও বেশি দূর যাওয়া।

এর আগের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে ৮০০ মিলিয়ন (৮০ কোটি) ডলারের সফটওয়্যার রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এক বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের টার্গেট বা লক্ষ্য  ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য রপ্তানি করা। সফটওয়্যার রপ্তানিতে ক্যাশ ইনসেনটিভ দেওয়াসহ, এখাতের উন্নয়নের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কারণে ২০১৮ সালে সফটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে। ২০২০ সালের আগেই তা এক বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।

নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা আর সমস্যা পাশ কাটিয়ে সফটওয়্যার খাত সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানান প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা। সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানির অবস্থাও যথেষ্ট ভালো বলে মনে করছেন অনেকই। এই খাত বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় ১৫টি রপ্তানি খাতের একটি। আইটি ও আইটি সক্ষম সেবা (আইটি-আইটিইএস) শিল্পের ‘বেটিং অন দ্য ফিউচার-দ্য বাংলাদেশ আইটি-আইটিইএস ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক শ্বেতপত্রে ২০১৭ সালে স্থানীয় আইটি ও আইটিইএস শিল্পের রাজস্ব উত্পাদন ০.৯-১. ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২৫ সালে তা পাঁচ গুন বেড়ে ৪.৬-৪. ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

 

সফটওয়্যার খাতে কাজের চিত্র

 

বর্তমানে সফটওয়্যার খাতের যেসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওয়েবসাইট তৈরি ও ডিজাইন, মোবাইল অ্যাপস, গেমস, অ্যাপ্লিকেশন প্ল্যাটফর্ম, ভিওআইপি অ্যাপ্লিকেশন, ডেটা এন্ট্রি, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রি-প্রেস, ডিজিটাল ডিজাইন, সাপোর্ট সেবা, কাস্টমাইজড অ্যাপ্লিকেশন তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের কয়েকটি সফটওয়্যার উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সফটওয়্যার রপ্তানি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে আয় বেশি। অন্যান্য সেবা খাতের আয় বেশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে। বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের সফটওয়্যার নির্মাতাদের তৈরি ইআরপি সলিউশনের চাহিদা বেশি। এর পাশাপাশি চ্যাটধর্মী অ্যাপ্লিকেশন, বিলিং সফটওয়্যার, মোবাইল অপারেটর ও নেটওয়ার্ক পরিচালনার সফটওয়্যারের চাহিদা রয়েছে। সফটওয়্যার রপ্তানির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি পর্যায়ের ডিজিটালাইজেশনের কাজে বাংলাদেশের একাধিক প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করছে।

ভারত, চীন ও ইউরোপের দেশগুলোর পাশাপাশি এখন ফিলিপাইন, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। তবে দেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া ব্লকচেইন, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেনে্সর মতো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে মানানসই প্রযুক্তি নিয়ে দেশি উদ্যোক্তাদের কাজ করতে হবে।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো যেমন হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার প্রযুক্তি পার্ক, সবখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট-সংযোগ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি বাড়াতে পারলে আরও দ্রুত সফটওয়্যার খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব।

বেসরকারি সমীক্ষা মতে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবী ছাড়াও দেশে ফ্রিল্যান্স-আউটসোর্সিংয়ে জড়িত আছেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী তৈরির প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। দেশে ১০ লাখ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী তৈরির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে সরকারের চলমান উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন ও সামনের দিনগুলোতে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই ১০ লাখ পেশাজীবী তৈরি ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সম্ভব।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, বিগত ৯ বছরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটছে। এ খাতে নানা সাফল্যের কাহিনীও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সরকার চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আবির্ভাব এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রস্ততি গ্রহণ করছে। বিগ ডেটা অ্যানালাইটিক, ইস্টারনেট অব থিংস, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেনে্সর মতো ক্ষেত্র সমূহের জন্য প্রশিক্ষিত মানুষ তৈরি করা হচ্ছে।  আইটি শিল্পে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগে উত্সাহিত করার জন্য নানা ধরণের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার আইসিটি রপ্তানির লক্ষ্য পূরণ। 

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এ বছর আমাদের দেশ থেকে বহির্বিশ্বে কমপক্ষে এক বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের আইসিটি পণ্য ও সেবা রফতানি হয়েছে। একইসঙ্গে এ বছরের আরেকটি বড় অর্জন হচ্ছে, রফতানিকারকদের জন্য সরকারের ১০ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা। 

২০১৯ সালে বেশকিছু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দারুণ সফলতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এগুলোর মধ্যে শুরুতেই বলতে হয় এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যাওয়ার্ড (অ্যাপিকটা)-২০১৯ এর কথা। ভিয়েতনামের হা লং এ ১৯তম আসরে সর্বাধিক ৮টি পদক অর্জন করে বাংলাদেশ। তিনটি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন এবং পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মেরিট স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। 

২০১৯ সালকে দেশের আইসিটি খাতের জন্য ব্যাপক সাফল্যময় একটি বছর হিসেবে দাবি করেছেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে রূপকল্প সেটি বাস্তবায়ন শেষ করার সুযোগ দেশের জনগণ এবার আমাদের দিয়েছেন, আবারও সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার চারটি মূল স্তম্ভ আছে আমাদের- মানবসম্পদ উন্নয়ন, সবার জন্য ইন্টারনেট, ই-গভর্নেনস এবং আইসিটি পণ্য রফতানি। চারটি স্তম্ভেই আমরা কাজ করেছি এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেশন সেন্টার চালু করেছি, আমাদের তরুণরা জাপান যাচ্ছে। ইন্টারনেটের জন্য এ বছর নতুন করে প্রায় দুই হাজার ইউনিয়নসহ সবমিলিয়ে তিন হাজারের বেশি ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার পৌঁছে গেছে। এছাড়া বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম সরকারি ডাটা সেন্টার এ বছর চালু করেছি আমরা। মাননীয়  প্রধানমন্ত্রী ২০০ পেটাবাইট ক্ষমতাসম্পন্ন আমাদের এই ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার উদ্বোধন করেন। 

পলক আরও বলেন, হাইটেক পার্কগুলোতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আইসিটি খাতে সবমিলিয়ে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পেয়েছি আমরা। অন্যদিকে ই-গভর্নেনে্স ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১৬৪টি সরকারি সেবাকে আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে পেরেছি। 

সফটওয়্যারের খাতের সাফল্য ও স্থানীয় বাজারের সক্ষমতা বেসিস সফটএক্সপো ২০২০ এ তুলে ধরা হবে। সফটএক্সপো নিয়ে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করতে পারে https://softexpo.com.bd/ ঠিকানায়।