একটুখানি ভালো করিয়া বসবাস আর রোজগারের আশায় বুক বাঁধিয়া নিম্নবিত্ত ঘরের মানুষেরা একটুখানি অবস্থাসম্পন্ন ঘরে গৃহকর্মীর কাজে নিযুক্ত হন। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে একজন গৃহকর্মীর কাজে যোগদানের পুরা প্রক্রিয়াটিই হয় মৌখিকভাবে। তাহাদের নামমাত্র বেতন থাকে বা থাকে না, কোনোরকমে মাথা গুঁজিবার ঠাঁই আর দিনরাত ২৪ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজই শেষ কথা। আসলে, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যেই সকল কর্মসূচি নেওয়া হয়, এই গৃহকর্মীদের পরিবার সেই সকল কর্মসূচি তথা জালের ফাঁকফোকর দিয়া পড়িয়া যায় বিধায় গৃহকর্মে যেইটুকু বেতন পান, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান পান, উহাতেই তাহারা সন্তুষ্ট থাকেন। ইহা সত্য যে, অনেক গৃহকর্তা-কর্ত্রীই আছেন যাহারা তুলনামূলক মানবিক, ন্যায়পরায়ণ, কর্মী সচেতন। আবার অনেকেই আছেন যাহারা গৃহকর্মীদের মানুষ বলিয়াই মনে করেন না। যথেচ্ছচার অত্যাচারের পাশাপাশি বিবিধ অমানবিক আচরণ করিতে তাহারা কুণ্ঠিত হন না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ হারাইতেও হয় অসহায় গৃহকর্মীদের। তাহার বিচারও শেষাবধি ঠিকঠাকভাবে হয় না। এমনই চিত্র স্পষ্ট হইয়াছে বিগত তিন দিন ধরিয়া ইত্তেফাকে প্রকাশিত এতত্সংক্রান্ত প্রতিবেদনে।
পুলিশ সদর দপ্তরের নথিপত্র বিশ্লেষণ করিয়া দেখা গিয়াছে, রাজধানীসহ সারা দেশে যেই সকল গৃহকর্মী খুন ও নির্যাতনের শিকার হন তাহার বেশির ভাগ ঘটনায় গৃহকর্ত্রীরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। কখনো কখনো গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্তার ছেলেমেয়ে আত্মীয়স্বজনদের দ্বারাও নির্যাতনসহ ধর্ষণের শিকার হইতেছেন অনেক অসহায় গৃহকর্মী। অবশ্য দেশে প্রতিদিন কত সংখ্যক গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হইতেছেন—তাহার সঠিক পরিসংখ্যান কাহারো কাছেই নাই। তবে নির্যাতনের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা নানাভাবে চাপা পড়িয়া যায়। এমনকি সমগ্র দেশে গৃহকর্মীর প্রকৃত সংখ্যাও জানা নাই। তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্র মনে করে, এই সংখ্যা ২৫ লক্ষের বেশি। শুধু হত্যাকাণ্ড বা মুমূর্ষু অবস্থায় কোনো গৃহকর্মী হাসপাতালে ভর্তি হইলেই নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পায় মাত্র। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে অবশ্য এই চিত্রও উঠিয়া আসিয়াছে যে, বাস্তবে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা পরিসংখ্যানের চাইতেও অনেক বেশি। এমনকী আইনজীবী, খেলোয়াড়, শিল্পী, ডাক্তার, সাংবাদিক, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কোনো পেশার মানুষের বাসাতে বাদ নাই যেইখানে গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয় নাই। অনেকের চোখেই গৃহকর্মীরা যেন তাহাদের বাড়ির ‘দাস’। এই জন্য একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধও অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন উঠিতে পারে, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন মানবেতর জীবনযাপন করিতে বাধ্য হইতেছেন? ইহা স্পষ্ট করিয়া বলা যায় যে, আমাদের প্রকৃত শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক বিকাশ সাধনের মাধ্যমেই মুছিয়া ফেলা সম্ভব হইবে এই মানবেতর চিত্র। অর্থাত্ শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে যেমন আমরা অনুধাবন করিতে পারিব মানুষের প্রতি মানবিক হইবার বিকল্প নাই, তেমনি অর্থনৈতিক বিকাশ যত বেশি হইবে দরিদ্র জনসংখ্যাও হ্রাস পাইবে তত। ইহার জন্য সময়ের প্রয়োজন।
